একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে সারের ডিলারশিপ বা পরিবেশক লাইসেন্স বরাদ্দ দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে প্রণীত সরকারি নীতিমালার কার্যকারিতায় হাইকোর্ট যে স্থিতাবস্থার আদেশ দিয়েছিলেন, তা স্থগিত করে দিয়েছেন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত। ফলে বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তির পক্ষে একযোগে সারের ডিলারশিপ নেওয়ার সমস্ত সুযোগ আপাতত বন্ধই থাকল।
গত বুধবার (৭ অক্টোবর) হাইকোর্টের দেওয়া সেই আদেশ স্থগিত করার জন্য রাষ্ট্রপক্ষের করা জরুরি আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হকের আদালত এই আদেশ প্রদান করেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের শুনানিতে নেতৃত্ব দেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবা জুঁই। অন্যদিকে রিটকারীদের পক্ষে আইনি লড়াইয়ে অংশ নেন আইনজীবী ইকরামুল হক টুটুল।
এর আগে, একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তি সারের ডিলারশিপ নিতে পারবে না—এমন বিধানসংবলিত সরকারি নীতিমালাকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেছিলেন মোট পাঁচজন ব্যক্তি। ওই রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের একটি বিশেষ বেঞ্চ সংশ্লিষ্ট নীতিমালার কার্যকারিতার ওপর স্থিতাবস্থার আদেশ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে হাইকোর্টের সেই নির্দেশনার বিরুদ্ধে দ্রুত আপিল বিভাগে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ।
চেম্বার আদালতের এই গুরুত্বপূর্ণ আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের সামনে বিস্তারিত তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশে সার ডিলার ও সার বিতরণ সংক্রান্ত ২০০৯ সালের পুরোনো যে নীতিমালা ছিল, সেখানে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের ডিলারশিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আইনি বাধা ছিল না। এর ফলে স্বামী, স্ত্রী, সন্তান কিংবা পুত্রবধূর নামে লাইসেন্স নিয়ে একধরনের পারিবারিক মনোপলি বা সিন্ডিকেট তৈরি করা হতো।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই অবস্থার অবসান ঘটিয়ে দীর্ঘদিনের পারিবারিকীকরণ রোধ করতে এবং রাষ্ট্র ও কৃষককে জিম্মি করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে বর্তমান সরকার চলতি বছরের আগস্টে নীতিমালায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন আনে। যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়, একই পরিবারভুক্ত একাধিক ব্যক্তি আর নতুন করে সারের ডিলারশিপ নিতে পারবেন না।
অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, পারিবারিকভাবে বছরের পর বছর এই ব্যবসার একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখা পাঁচজন ব্যক্তি গত ৬ অক্টোবর হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চে এই সংশোধনমূলক নীতিমালাকে চ্যালেঞ্জ করে দুটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। ওই রিটগুলোর মাধ্যমে তারা অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ চেয়েছিলেন, যাতে বর্তমান ২০২৬ সালের নতুন ডিলারশিপ নিয়োগ প্রক্রিয়া চললেও তাদের বিদ্যমান লাইসেন্স বাতিল না হয় এবং তারা যেন পুরোনো নিয়মে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারেন। সে সময় তারা হাইকোর্ট থেকে একটি স্থিতাবস্থার আদেশও লাভ করেছিলেন।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো আইনি যুক্তি তুলে ধরে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, যে নীতিমালা তারা চ্যালেঞ্জ করেছেন, তা তো এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়নের বা বিতরণের পর্যায়ে যায়নি, কারণ নতুন ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়াটাই কেবল চলমান রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার্থে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস তাৎক্ষণিকভাবে উদ্যোগ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল দায়ের করে।
আজ চেম্বার বিচারপতির আদালতে নিয়মিত কার্যতালিকার বাইরে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মামলাটি শুনানির জন্য নেওয়া হয়। এ সময় রিটকারীদের আইনজীবী একরামুল হক টুটুলের বক্তব্যও মনোযোগ সহকারে শোনেন আদালত। উভয়পক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে চেম্বার জজ আদালত হাইকোর্টের দেওয়া স্থিতাবস্থার আদেশটি স্থগিত করেন।
এই আদেশের আইনি তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, এর ফলে সরকারের প্রণীত নীতিমালা বহাল থাকল। একই পরিবার থেকে একাধিক ব্যক্তিকে লাইসেন্স দেওয়ার সুযোগ বন্ধ করার মাধ্যমে সারের বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সুনিশ্চিত হবে। পাশাপাশি দেশের কৃষকরা যাতে কোনো ধরনের সার সংকটের বা দালালের হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতেই সরকারের এই জনকল্যাণকর নীতিমালা এখন পূর্ণাঙ্গভাবে বহাল রইল।