বিচারবহির্ভূত ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরের বিতর্কিত বক্তব্য সরাসরি প্রত্যাখ্যান ও নাকচ করেছে সরকার। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন দল বিএনপিও এই বক্তব্যকে সরকারের জন্য চরম বিব্রতকর বলে অভিহিত করেছে। তবে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন এক বিবৃতিতে আইজিপির বক্তব্যের পক্ষে সাফাই গেয়ে একে আইন প্রয়োগের একটি সময়োপযোগী আহ্বান বলে দাবি করেছে।
গত সোমবার (২৬ অক্টোবর ২০২৬) পুরান ঢাকার চকবাজারে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানকালে আইজিপি আলী হোসেন ফকির বলেন, “সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে ‘ক্রসফায়ার’ করা হবে।” তিনি আরও মন্তব্য করেন, পুলিশ বলপ্রয়োগ করলে এক পক্ষ তাদের ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে, আবার নিষ্ক্রিয় থাকলে ‘দুর্বল’ আখ্যা দেয়; ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ দিতে হবে।
আইজিপির এই বক্তব্য মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর জাতীয় রাজনীতি ও মানবাধিকার অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। জামায়াতে ইসলামী তাঁকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বলে এবং এনসিপি (জাতীয় নাগরিক পার্টি) তাঁর পদত্যাগ দাবি করে।
এই বিতর্কের মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সরকারের পক্ষ থেকে অবস্থান পরিষ্কার করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি ইত্তেফাককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইজিপির বক্তব্য সরাসরি খারিজ করে বলেন, “সরকার তো ক্রসফায়ার চায় না; বরং সরকার যেকোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতিতে বিশ্বাসী। আইজিপি অসতর্কতাবশত এমন মন্তব্য করে থাকতে পারেন; তবে এটা ঠিক হয়নি এবং উচিত হয়নি।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান সরকার বেআইনি ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু (কাস্টডিয়াল ডেথ) কোনোভাবেই সহ্য করবে না। আইনের শাসন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন সরকারের প্রধান লক্ষ্য ও অগ্রাধিকার। দেশে এ পর্যন্ত ক্রসফায়ার বা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি উল্লেখ করে তিনি জানান, আইনসম্মত উপায়ে অপরাধ দমনে যা যা প্রয়োজন সরকার তা-ই করবে।
অন্যদিকে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত নিখরচায় চিকিৎসাসেবা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আইজিপির মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, “যে বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে রাজপথে লড়াই করেছে, সেই দলের সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে পুলিশপ্রধানের মুখে ‘ক্রসফায়ার’-এর কথা আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে। এটি সরকারকে স্পষ্টত বিব্রত করার মতো অবস্থা। দেশে পর্যাপ্ত আইন রয়েছে এবং সেই আইন দিয়েই অপরাধ দমন করা সম্ভব; বেআইনি কোনো পদ্ধতি কখনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।” তিনি দায়িত্বশীল পদে থেকে বক্তব্য প্রদানের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
এদিকে সরকারের সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে জাপান সফরে রয়েছেন। সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার পরই আইজিপির বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত বিবেচনা করা হবে। তবে তিনি ইঙ্গিত দেন, আইজিপির বক্তব্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কিছু ভুল বোঝাবুঝি (মিস কমিউনিকেশন) সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।
অন্যদিকে আইজিপির পাশে দাঁড়িয়ে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানায়, আইজিপির বক্তব্যকে প্রচলিত আইন ও বিধিমালার যথাযথ, কঠোর ও আপসহীন বাস্তবায়ন এবং মাঠপর্যায়ে জননিরাপত্তা রক্ষায় সক্ষমতা সুদৃঢ় করার আহ্বান হিসেবে দেখা উচিত। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পুলিশের আইনানুগ কঠোরতাকে নেতিবাচকভাবে দেখা এবং অপরাধ দমনে নিষ্ক্রিয়তাকে দুর্বলতা ভাবার প্রবণতা মাঠে দায়িত্ব পালনরত সদস্যদের দ্বিধাগ্রস্ত করে তুলতে পারে, যা সুযোগ নিয়ে অপরাধীদের উৎসাহিত করার ঝুঁকি তৈরি করে।
(সূত্র: ইত্তেফাক/এনএন)