চাঞ্চল্যকর সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছর অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত খুনিদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি এবং উন্মোচিত হয়নি এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য (মোটিভ)। তিনটি তদন্ত সংস্থা ঘুরে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স টানা দুই বছর তদন্ত চালিয়েও আলোচিত এই মামলার কোনো কুলকিনারা করতে পারেনি।
গতকাল মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর ২০২৬) হাইকোর্টে টাস্কফোর্সের পক্ষ থেকে ২৭ পৃষ্ঠার এক অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। তদন্ত সম্পন্ন করতে টাস্কফোর্স এক বছরের সময় আবেদন করলে বিচারপতি সিকদার মাহমুদুর রাজী ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট দ্বৈত বেঞ্চ ছয় মাসের সময় মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে আগামী ২০২৭ সালের ২৯ এপ্রিল চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেছেন আদালত। উক্ত দিনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহাকে আদালতে সশরীরে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগে টাস্কফোর্স তিন দফায় ছয় মাস করে সময় পেলেও হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।
তবে গত আগস্ট মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার এক বক্তব্যে এই মামলায় নতুন মোড় নেয়। তিনি দাবি করেন, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে র্যাবের গোয়েন্দা প্রধানের দায়িত্বে থাকা সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান ও এক প্রভাবশালী মিডিয়া ব্যক্তিত্বের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে, যা জিয়াউল আহসানের এক সহযোগীকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে উন্মোচিত হয়। ট্রাইব্যুনাল কী তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে তা হস্তান্তরের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ইতিমধ্যে চিফ প্রসিকিউটরকে চিঠি পাঠিয়েছে।
গতকাল আদালতে দাখিল করা অগ্রগতি প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। বাদীপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবী শিশির মনির। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কারা জড়িত তা নিয়ে সরকারের গোপন করার কিছু নেই। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যারা তদন্তে যুক্ত ছিলেন, তাদের অনেকেই বর্তমানে আত্মগোপনে থাকায় তদন্তের ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত হয়েছে। তবে সবাই চায় সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসুক।”
হত্যাকাণ্ডে তাড়াহুড়ো করেনি খুনিরা, তারা পেশাদার ছিল না
হাইকোর্টে জমা দেওয়া টাস্কফোর্সের অগ্রগতি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পারিবারিক বা দাম্পত্য কলহের কারণে এই দম্পতি খুন হননি। আবার একজন অন্যজনকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করেছেন—এমন কোনো প্রমাণও মেলেনি। ফরেনসিক চিকিৎসায় প্রমাণিত যে, দুজনকেই নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আলামত ও ক্ষতের ধরন দেখে প্রতীয়মান হয়, খুনিরা হত্যাকাণ্ড সংঘটনে কোনো তাড়াহুড়ো করেনি এবং মৃত্যুর পূর্বে ভিকটিমরা দীর্ঘক্ষণ ক্ষতের যন্ত্রণা সহ্য করে জীবিত ছিলেন। তবে লাশের সুরতহাল অনুযায়ী সাগর ও রুনির শরীরের স্পর্শকাতর অঙ্গসমূহে পেশাদার খুনিদের স্টাইলের মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন না থাকায় খুনিরা পেশাদার ছিল না বলে মনে করছে টাস্কফোর্স।
উদ্ধার হয়নি ল্যাপটপ, পাওয়া যাচ্ছে না তৎকালীন কর্মকর্তাদের
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর লুটের শিকার সাগর-রুনির ব্যবহৃত দুটি ল্যাপটপ ও একটি মোবাইল ফোন আজ পর্যন্ত উদ্ধার করা যায়নি। তদন্তের স্বার্থে তৎকালীন পুলিশ প্রধান (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার, ডিএমপির তৎকালীন ডিবি প্রধান মনিরুল ইসলাম, তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক মোখলেসুর রহমান এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ইতিমধ্যে এক সাংবাদিককে জিজ্ঞাসা করে তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে এবং অন্যদের অনুসন্ধানের চেষ্টা চলছে।
ভিসেরা ও ডিএনএ পরীক্ষায় অমীমাংসিত রহস্য
মামলার পূর্ববর্তী কর্মকর্তারা ১৬৭ জন এবং টাস্কফোর্স ৯০ জন সাক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ২৪ জনের জবানবন্দি রেকর্ড করেছে। নিহতদের ভিসেরা রিপোর্টে কোনো প্রকার চেতনানাশক পদার্থের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাবে প্রেরিত ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টে দেখা যায়, ঘটনাস্থলে উদ্ধার করা আলামতে মোট চারজন ব্যক্তির ডিএনএ পাওয়া গেছে (তিনজন পুরুষ ও একজন নারী)। এর মধ্যে দুজনের ডিএনএ সাগর ও রুনির সাথে মিললেও বাকি দুজন অজ্ঞাত পুরুষের ডিএনএ কার—তা গত ১৪ বছরেও উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি।
এছাড়া রাষ্ট্রপক্ষ আদালতকে জানিয়েছে, জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাসভবন থেকে জব্দ করা ৩০০টি সিডির মধ্যে ৯০টির পর্যালোচনা সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ২১০টি সিডিতে থাকা কল রেকর্ড, অডিও-ভিডিও ও তথ্য মূল্যায়নের কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।
(প্রেক্ষাপট: ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় নির্মমভাবে খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনি। মামলাটি প্রথমে শেরেবাংলা নগর থানা, পরবর্তীতে ডিবি এবং হাইকোর্টের আদেশে টানা ১২ বছর ৬ মাস ১৬ দিন র্যাব তদন্ত করে। সরকার পরিবর্তনের পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে পিবিআই প্রধানকে আহ্বায়ক করে গঠিত চার সদস্যের টাস্কফোর্স বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে।)