বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বাণিজ্যিক পথ হরমুজ প্রণালিতে নৌমাইনে (সামুদ্রিক মাইন) আঘাত হানার ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে আড়াই হাজার কনটেইনার ধারণক্ষমতার একটি বিশাল পতাকাবাহী জাহাজ ডুবে গেছে।
আজ বুধবার ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা ‘মেহের নিউজ এজেন্সি’র বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর দাবি অনুযায়ী, নির্ধারিত ও অনুমোদিত নিরাপদ নৌপথ অনুসরণ না করে অত্যন্ত বিপজ্জনক ও অননুমোদিত রুট দিয়ে প্রণালিটি অতিক্রম করার চেষ্টা করছিল জাহাজটি। ঠিক সেই সময়ই এটি অজ্ঞাত কোনো নৌমাইনে সজোরে আঘাত হানে, যার ফলে তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণ ঘটে এবং জাহাজে আগুন ধরে যায়। একপর্যায়ে সেটি সম্পূর্ণ ডুবে যায়।
তবে দুর্ঘটনাগ্রস্ত ওই জাহাজটির নাম কী ছিল, এটি কোন দেশের পতাকাবাহী জাহাজ ছিল, ভেতরে ঠিক কী ধরনের পণ্য পরিবহন করা হচ্ছিল কিংবা ওই সময় জাহাজে মোট কতজন নাবিক বা ক্রু কর্মরত ছিলেন—এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এমনকি এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় কেউ হতাহত হয়েছেন কি না, সে বিষয়টিও এখনও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
আইআরজিসির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, জাহাজটি সম্পূর্ণ ঝুঁকি নিয়ে অননুমোদিত পথে চলাচল করছিল এবং এর সঙ্গে চোরাচালানের যোগসূত্র থাকতে পারে। তবে আইআরজিসির এই দাবির সত্যতা আন্তর্জাতিক বা স্বাধীন কোনো মাধ্যমের সাহায্যে তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
হরমুজ প্রণালিতে বাড়ছে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক জলযানগুলোতে দফায় দফায় হামলা ও সার্বিক নিরাপত্তাঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক জলপথের আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন এবং বিশ্ববাজারের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগের মেঘ জমেছে।
এর আগে গত মঙ্গলবারও এই একই প্রণালিতে অপর একটি কনটেইনারবাহী জাহাজ এবং একটি তেলবাহী ট্যাংকার অজ্ঞাত বস্তু বা ক্ষেপণাস্ত্রের অতর্কিত আঘাতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে জানিয়েছিল যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালনাসংক্রান্ত সংস্থা ‘ইউকেএমটিও’। ওই সময় সংস্থাটির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট রুটে চলাচলকারী সব বাণিজ্যিক জাহাজকে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করার এবং যেকোনো ধরনের সন্দেহজনক গতিবিধি দেখলে অবিলম্বে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান যুদ্ধাবস্থা শুরুর পূর্বে বিশ্বের মোট ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশই এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। ফলশ্রুতিতে, এই জলসীমায় সামান্য সামরিক উত্তেজনা কিংবা জাহাজ চলাচলে কোনো বিঘ্ন ঘটলে তার সরাসরি ও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। সাম্প্রতিক এসব হামলা ও লাগাতার নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে জলযান মালিক ও শিপিং কোম্পানিগুলোর মধ্যে আতঙ্ক দিন দিন চরম আকার ধারণ করছে। প্রণালিটি দিয়ে পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আকাশচুম্বী হতে পারে জাহাজের বিমা ও পরিবহন খরচও।
নৌ চলাচলে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে ইরান
হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের আধিপত্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অজুহাতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে বারবার নির্দিষ্ট নৌপথ ব্যবহার করা এবং আইআরজিসির নৌবাহিনীর সঙ্গে সার্বিক সমন্বয় করে জলযান পরিচালনার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, নির্ধারিত নিয়মের বাইরে অনুমোদনহীন পথে চলাচলকারী নৌযানগুলো পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করছে এবং এগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন অবৈধ পণ্য চোরাচালান করা হচ্ছে। যদিও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানের এসব দাবির সত্যতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন রয়েছে।
সর্বশেষ এই কনটেইনারবাহী জাহাজ ডুবে যাওয়ার মর্মান্তিক ঘটনা হরমুজ প্রণালিতে নিয়মিত চলাচলকারী শত শত বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এক অনিশ্চিত হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। সার্বিক এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির ওপরই নির্ভর করছে বিশ্ব বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের স্বাভাবিক ধারা।
(সূত্র: আল-জাজিরা / বিডি প্রতিদিন/একেএ)