বিগত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে নিজেদের ভূখণ্ডে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ও ভয়াবহ হামলার মুখোমুখি হওয়ার পর বর্তমানে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে চরম পথ খুঁজছে সৌদি আরব। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা যেভাবে ধারাবাহিকভাবে সৌদি আরবে বিধ্বংসী আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে রিয়াদ কীভাবে ও কোন কৌশলে এর জবাব দেবে—তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
গত সপ্তাহে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি বাহিনীকে সামরিক সহায়তা দিতে বড় ধরনের অভিযান শুরু করেছিল সৌদি আরব। তবে এত কিছুর পরও হুথি বিদ্রোহীরা শক্ত হাতে নিজেদের রণক্ষেত্র ও অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
সামরিক অভিযানের জবাবে উল্টো সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নিজেদের আক্রমণের তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে হুথিরা। এরই ধারাবাহিকতায় গত শনিবার দেশটির রাজধানী রিয়াদের গুরুত্বপূর্ণ কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় গোষ্ঠীটি। ওই রক্তক্ষয়ী হামলায় অন্তত ১৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংঘাতের ক্ষেত্রে ইরান যে কৌশল অবলম্বন করে থাকে, ঠিক একই পথ অনুসরণ করে সৌদি আরবে আরও বড় ধরনের পাল্টা ও বিধ্বংসী হামলার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে হুথি বিদ্রোহীরা। বর্তমানে তারা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে, যার ফলশ্রুতিতে বিশ্ব অর্থনীতিতেও একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।
হুথি গোষ্ঠীর সঙ্গে সৌদি আরবের শত্রুতা বহু পুরোনো। রিয়াদ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই চালিয়ে আসছে, যে সংঘাত ইয়েমেনে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের জন্ম দিয়েছিল।
তবে সম্প্রতি সৌদি আরবে হুথিদের নতুন করে বাড়তে থাকা হামলাকে স্রেফ পুরোনো বৈরিতা হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা; বরং এটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান উত্তপ্ত যুদ্ধের একটি প্রত্যক্ষ অংশ ও সম্প্রসারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিগত ১১ বছর ধরে সামরিক অভিযান চালানোর পাশাপাশি একাধিকবার কূটনৈতিক আলোচনার পথ ধরে হুথিদের অগ্রগতি থামানোর চেষ্টা করেছে সৌদি আরব। তবে এবার হুথিদের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘাত এড়িয়ে চলার ক্ষেত্রে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং তাঁর ভাই, দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমানের কাছে খুব বেশি বিকল্প খোলা নেই।
এর পেছনে মূল কারণ হলো—সীমান্তের ওপারে হুথিরা দিন দিন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ইয়েমেনের একাধিক বড় শহরের ওপর তারা ইতিমধ্যে নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করার পাশাপাশি জনবহুল তাইজের মতো অন্যান্য কৌশলগত শহর দখলের জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
লেখক ও সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী শিহাবি সিএনএনকে জানান, ‘একবারেই এই বিশাল হুমকিকে চিরতরে মোকাবিলা করতে হবে। তবে অনেক কিছুই নির্ভর করছে যুদ্ধক্ষেত্রে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী ঠিক কতটা দক্ষতার পরিচয় দিতে পারে তার ওপর। আর রিয়াদ তাদের শক্তিশালী বিমান হামলা চালিয়ে সর্বাত্মক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।’
এখন পর্যন্ত সৌদি আরব মূলত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর পক্ষে হুথিদের আস্তানায় বিমান হামলা চালানোর মধ্যেই নিজেদের সামরিক ভূমিকা সীমিত রেখেছিল। তারা স্থলভাগে সরাসরি বিপুল সংখ্যক সৈন্য মোতায়েন করা থেকে এতদিন সতর্কতার সাথে বিরত থেকেছে। কিন্তু গত শনিবার রিয়াদ বিমানবন্দরে আকস্মিক প্রাণঘাতী হামলার পর সৌদি আরব আর কত দিন এই কঠোর সংযম ধরে রাখতে পারবে, তা নিয়ে এখন বড় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
সৌদি আরব যদি এখন ইয়েমেনের অভ্যন্তরে সরাসরি পদাতিক সৈন্য পাঠায়, তবে দেশটিকে পার্বত্য ও দুর্গম ভূখণ্ডে এক দীর্ঘস্থায়ী এবং অতীব ব্যয়বহুল স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হবে। এতে করে একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগবান্ধব রাষ্ট্র এবং বৈশ্বিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সৌদি আরবের যে আকর্ষণীয় ভাবমূর্তি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান অত্যন্ত যত্ন ও সুপরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলছেন—তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে শক্তিশালী হুথি
অথচ মাত্র দুই দশক আগেও হুথিরা ইয়েমেনে ছিল একটি ছোট ও আঞ্চলিক ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠী। তবে পরবর্তীতে ইরানের প্রত্যক্ষ সামরিক ও কারিগরি সহায়তায় তারা একটি অপরাজেয় সশস্ত্র বাহিনীতে রূপ নেয়। বর্তমানে তাদের কাছে অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে এবং ইসরায়েলের তেল আবিবের মতো সুদূর লক্ষ্যবস্তুতেও সফল হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে গোষ্ঠীটি।