পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকা সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে সর্বোচ্চ ধৈর্য ও সংযম প্রদর্শনের উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান জটিল সংকট নিরসনে গত জুন মাসে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ অনুসরণে দুই দেশকেই নিজেদের দেওয়া চুক্তিগত প্রতিশ্রুতি কঠোরভাবে মেনে চলার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
আজ বুধবার (১৪ অক্টোবর) তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এক প্রতিবেদনে জানায়, পাকিস্তান সফরে আসা রাশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভ্লাদিমির খোলখোলৎসেভের সঙ্গে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি এই আহ্বান জানান। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্টের বাসভবন ও কার্যালয় থেকে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বৈঠকের আলোচনার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়।
বৈঠককালে যেকোনো সংঘাত নিরসনে যুদ্ধ নয়, বরং আলোচনা ও কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর বিশেষ জোর দেন পাক প্রেসিডেন্ট। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম মূল পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ এবং লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর অবাধ ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। পারস্য উপসাগরে সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক জাহাজে দফায় দফায় হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কেন্দ্র ও জাতীয় অবকাঠামো লক্ষ্য করে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন জারদারি।
তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক সংঘাতের এমন ব্যাপ্তি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিনষ্টের পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থার (সাপ্লাই চেইন) জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বিশ্বের প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানান তিনি।
উল্লেখ্য, বর্তমানে চার দিনের বিশেষ সরকারি সফরে পাকিস্তানে অবস্থান করছেন রাশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভ্লাদিমির খোলখোলৎসেভ। কূটনৈতিক ইতিহাসে এটিই কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত রুশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম ঐতিহাসিক পাকিস্তান সফর।
আয়োজিত বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের পাশাপাশি রাশিয়া ও পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধির বিষয়ে বিশদ আলোচনা হয়। ২০২৫ অর্থবছরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২৪ কোটি ৩৪ লাখ মার্কিন ডলার। প্রেসিডেন্ট জারদারি আক্ষেপ করে বলেন, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক লেনদেনের এই পরিমাণ উভয় দেশের প্রকৃত সম্ভাবনা ও সামর্থ্যের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। দুই দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে যে চমৎকার সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান, তাকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্য বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
রুশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও একই মত পোষণ করে বলেন, বিদ্যমান বাণিজ্যের পরিসংখ্যান দুই দেশের প্রকৃত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের শক্তিকে প্রতিফলিত করে না; এখানে বাণিজ্য বহুগুণ বাড়ানোর বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। সফল আলোচনা শেষে তিনি প্রেসিডেন্ট জারদারিকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানান।
দিনের পৃথক আরেক অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন সফররত রুশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খোলখোলৎসেভ। সেখানে সংঘবদ্ধ আন্তঃদেশীয় অপরাধ, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ, উগ্র চরমপন্থা, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান দমনের পাশাপাশি ফিশিং, ক্রিপ্টোকারেন্সি জালিয়াতি ও টেলিফোন স্ক্যামের মতো ক্রমবর্ধমান সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় যৌথভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত হয়।
ইসলামাবাদে অবস্থিত রুশ দূতাবাস থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, দুই দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নিজ নিজ পারস্পরিক সুসম্পর্ক ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়েই এই দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার মজবুত ভিত্তি গড়ে তোলা হয়েছে।