দৈনিক বাংলার আকাশ ডেস্ক:
টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার জয় করা নাগাল্যান্ডের চলচ্চিত্র ‘আংহ’ সম্পর্কিত সংবাদটি আরও আকর্ষণীয়, প্রাঞ্জল ও পেশাদারভাবে নিচে পুনর্লিখন করা হলো:
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ছোট্ট রাজ্য নাগাল্যান্ডের কোন্যাক ভাষার চলচ্চিত্র ‘আংহ’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। মর্যাদাপূর্ণ টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি জিতেছে জুরিদের গুরুত্বপূর্ণ ‘প্লাটফর্ম পুরস্কার’। স্বতন্ত্র নির্মাণশৈলী এবং পরিচালকের অভিনব দৃষ্টিভঙ্গির স্বীকৃতিস্বরূপ এই পুরস্কার প্রদান করা হয়।
ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
ছবিটির পরিচালক থেজা রিওর এটিই প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। বিশেষ করে, চলচ্চিত্রটির অভিনয়শিল্পীদের বড় একটি অংশ এর আগে কখনো ক্যামেরার সামনে কাজ করেননি। পাশাপাশি, নাগাল্যান্ডের কোন্যাক ভাষাটি ভারতের অধিকাংশ দর্শকের কাছেই সম্পূর্ণ অপরিচিত। এমন প্রেক্ষাপটে টরন্টোর মতো বিশ্বমঞ্চে ছবিটির এই অর্জন ভারতীয় স্বাধীন চলচ্চিত্রের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক মাইলফলক।
যেসব বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত ‘আংহ’: চলচ্চিত্রটির পটভূমি ১৯৬০-এর দশকের শুরুর দিককার নাগাল্যান্ড। সে সময় আসাম রাজ্যের অংশ থাকা নাগাল্যান্ড ১৯৬৩ সালের ডিসেম্বরে ভারতের পৃথক রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ছবির মূল গল্পে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে কোন্যাক সম্প্রদায়ের একটি গ্রামের বয়স্ক বংশানুক্রমিক প্রধান ‘আহংবা’ এবং তার তরুণ ছেলের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও মানসিক টানাপোড়েন।
তৎকালীন সময়ে কোন্যাক সমাজে খ্রিষ্টধর্মের দ্রুত প্রসারের ফলে বহু পুরোনো বিশ্বাস, আচার ও সামাজিক রীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে শুরু করে। একদিকে আহংবা তার পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য ও বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে রাখতে চান, অন্যদিকে তার ছেলে কৌতূহলী হয়ে ওঠে নতুন পৃথিবীর প্রতি। ঠিক সে সময়ই এক মার্কিন ধর্মপ্রচারকের (স্কটিশ অভিনেতা ডগলাস হেনশাল) আগমন ঘটে তাদের এলাকায়, যা গল্পে এনে দেয় ভিন্ন মাত্রা।
পরিচালক থেজা রিও জানান, কয়েক বছর আগে মোন এলাকায় অন্য একটি কাজের সুবাদে তিনি এই গল্পের প্রেরণা পান। একই পরিবারের মধ্যে যেন একাধিক প্রজন্ম ও যুগের সহাবস্থান লক্ষ করেছিলেন তিনি। যেখানে একজন দাদা হয়তো একসময় শিকারি যোদ্ধা ছিলেন, আর তার নাতি রক ব্যান্ডে গিটার বাজাচ্ছেন। অতীত ও বর্তমানের এই সহাবস্থানকেই পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন তিনি।
চলচ্চিত্র নির্মাণে চ্যালেঞ্জ ও শৈল্পিক দিক: ডিজিটাল যুগে এসে পরিচালক রিও ও চিত্রগ্রাহক অ্যাডাম পিয়েতকেভিচ অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে ছবিটি ১৬ মিলিমিটার ফিল্মে ধারণ করেন। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকের পুরোনো ছবি ও ভিডিও থেকে দৃশ্যগত অনুপ্রেরণা নিয়ে এর দানাদার আবহ ও বুনট বজায় রাখা হয়। ফিল্মে শুটিং করায় প্রতি চার-পাঁচ দিন পর পর দৃশ্য প্রসেসিংয়ের জন্য মুম্বাইয়ে পাঠাতে হতো, যা নির্মাণ প্রক্রিয়াকে বেশ চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছিল।
কোন্যাক সমাজের গবেষক ও পরামর্শদাতাদের সহায়তায় সংলাপ, পোশাক এবং শিল্প নির্দেশনায় শতভাগ খাঁটি ভাব বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। ছবির অন্যতম বড় প্রাপ্তি হলো—বহিরাগত পর্যটক বা ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে কোন্যাক জনগোষ্ঠীর মানুষের নিজস্ব আবেগ, শোক, ভালোবাসা ও দ্বন্দ্বকে নিখাদভাবে তুলে ধরা।
অস্কারের সম্ভাবনার দুয়ার: জুরিরা ‘আংহ’-এর ‘সতেজ দৃষ্টিভঙ্গি’ এবং বিশ্বমঞ্চে বিরল এক সংস্কৃতির নান্দনিক চিত্রায়নের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এই পুরস্কারের সুবাদে ছবিটি ২০২৭ সালের অস্কারের আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে বিবেচনার যোগ্য হয়ে ওঠার একটি সম্ভাব্য পথ তৈরি করেছে। বর্তমান অস্কারের নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কয়েকটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মনোনীত পুরস্কারবিজয়ী ছবি নিজ দেশের আনুষ্ঠানিক মনোনয়নের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করেও অস্কারে মূল্যায়নের যোগ্য হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ছবিটি ইতিমধ্যে অস্কারে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়ে গেছে।
প্রথম চলচ্চিত্রেই বাজিমাত করা পরিচালক থেজা রিও মনে করেন, নাগাল্যান্ডের চলচ্চিত্রশিল্প এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে ‘আংহ’-এর এই আন্তর্জাতিক সাফল্য নাগাল্যান্ডের অন্যান্য প্রতিভাবান নির্মাতাদেরও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের গল্প নিয়ে আসার অনুপ্রেরণা জোগাবে।