ইরানের তীব্র ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দুই ডজনেরও বেশি সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব হামলায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর হাজার কোটি ডলারের সরঞ্জাম ও অবকাঠামো ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে পাকিস্তানি ইংরেজি দৈনিক দ্য এক্সপ্রেস ট্রাইব্যুনাল। ৩০ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমটির এই প্রতিবেদনটি মূলত বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর একটি বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ এবং সংঘাতের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন চারজন আঞ্চলিক কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরেছে এপি। অনুসন্ধানে জানা যায়, গত আগস্ট মাস পর্যন্ত ইরান কিংবা তেহরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর চালিত ১১৫টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ২৬টি সামরিক ঘাঁটি এবং বিভিন্ন স্থাপনার ভবন ও সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শুরুতেই রাডার ধ্বংসের সুনির্দিষ্ট কৌশল
এপির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ইরান অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে প্রথমে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর আগাম সতর্কবার্তা শনাক্তকারী রাডার ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করে। ফেবব্রুয়ারির শেষ দিকে সংঘাত শুরুর প্রথম দুই দিনের মধ্যেই কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজান এবং বাহরাইনের নৌবাহিনী সহায়তা কেন্দ্রে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষিত রাডার কাঠামো ধ্বংস করে দেয় তেহরান। এ ছাড়া সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি এবং জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটির বহনযোগ্য রাডারেও হামলা চালানো হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করা এসব রাডার অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং প্রতিস্থাপন করা দুরূহ। যেমন—জর্ডানে ধ্বংস হওয়া একটিমাত্র রাডার প্রতিস্থাপনে প্রায় ৫০ কোটি ডলার প্রয়োজন, যা মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিশ্বজুড়ে থাকা মাত্র ১৩টি ব্যবস্থার একটি। কাতারভিত্তিক আরেকটি রাডারও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, যা ২০১৩ সালে প্রায় ১১০ কোটি ডলার ব্যয়ে কেনা হয়েছিল। এসব হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পরবর্তী পাল্টা আক্রমণ চালানোর সক্ষমতা পঙ্গু করে দেওয়া।
সবচেয়ে বেশি হামলার শিকার কুয়েত
স্যাটেলাইটের ছবি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ইরানের প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল কুয়েতের মার্কিন স্থাপনাগুলো। এ ছাড়া বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন ঘাঁটিতেও একের পর এক হামলা চালানো হয়।
যুদ্ধের সময় মার্কিন সেনাদের ওপর সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাটি ঘটে কুয়েতের শুয়াইবা বন্দরে, যেখানে ১ মার্চ ড্রোন হামলায় ছয় মার্কিন সেনা নিহত হন। কুয়েতের আলী আল সালেম বিমানঘাঁটিতে অন্তত ৩০ বার হামলা চালানো হয়, যার ফলে ১৫টি বিমানের হ্যাঙ্গার এবং আবাসিক এলাকার ১০টি ভবন ধ্বংস হয়। এছাড়া কুয়েতের ক্যাম্প বুয়েরিংয়েও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে; সেখানে বিমান রাখার হ্যাঙ্গার, সেনাদের ব্যায়ামাগার, গ্যারেজ এবং খাবার ঘর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মার্কিন রণকৌশলে পরিবর্তন ও নিরাপত্তার প্রশ্ন
টানা এসব হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এপিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে যুদ্ধবিমান, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং যোগাযোগ সরঞ্জামসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক উপকরণ ও লজিস্টিকস অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে।
হামলার পর ট্রাম্প প্রশাসন ও পেন্টাগন এ বিষয়ে খুব সীমিত তথ্য প্রকাশ করায় এবং স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশে সামরিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা থাকায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র আড়ালে থেকে যায়। সেন্ট্রাল কমান্ড এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানালেও পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল দাবি করেছেন, মার্কিন সেনা ও ঘাঁটিগুলো পর্যাপ্ত সুরক্ষিত রয়েছে এবং বর্তমান সামরিক বাহিনী যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
বিশ্লেষকদের মতে, তুলনামূলক স্বল্পমূল্যের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে এই ধরনের বড় ক্ষতিসাধন আধুনিক যুদ্ধব্যবস্থায় প্রচলিত স্থায়ী সামরিক অবকাঠামোর নিরাপত্তাকে মারাত্মক প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। র্যান্ড স্কুল অব পাবলিক পলিসির জাতীয় নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিচালক রাফায়েল কোহেনের মতে, এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় ‘ঘুম ভাঙানোর সতর্কবার্তা’ এবং এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী সামরিক অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করার দিন ফুরিয়ে এসেছে।
(সূত্র: দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন / এপি)