দেশের কওমি ও হাফেজি মাদরাসাগুলোতে অতিরিক্ত শারীরিক শাস্তি, বেত্রাঘাত কিংবা শিক্ষার্থীদের প্রতি যেকোনো ধরনের অনুপযুক্ত স্পর্শের ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন সুপরিচিত ইসলামি চিন্তাবিদ ও বক্তা ড. মিজানুর রহমান আজহারী।
আজ রোববার (২৫ অক্টোবর ২০২৬) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া একটি দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ পোস্টে তিনি মাদরাসা শিক্ষার মানোন্নয়ন, আবাসিক শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
ফেসবুক পোস্টে আজহারী উল্লেখ করেন, দেশে দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে মাদরাসাগুলোর ঐতিহাসিক ভূমিকা অনস্বীকার্য হলেও সম্প্রতি কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অপ্রীতিকর ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার কারণে পুরো মাদরাসা শিক্ষার ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এই বাস্তবতায় দেশের প্রভাবশালী আলেমসমাজ ও দায়িত্বশীলদের নিয়ে খোলামেলা ও আত্মসমালোচনামূলক আলোচনার সময় এসেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। নিজের ভুল বা ত্রুটিগুলো নিজেরা সংশোধন না করলে অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষ এর সুযোগ নিতে পারে এবং গোটা দ্বীনি শিক্ষাব্যবস্থা সংকটে পড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
জবাবদিহিতা ও মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিতের তাগিদ
ধর্মীয় শিক্ষাদানকারী প্রতিষ্ঠান হওয়ার অর্থ এই নয় যে তা কোনো জবাবদিহি বা সুশাসনের ঊর্ধ্বে থাকবে। দেশের নানা প্রান্তে যত্রতত্র গড়ে ওঠা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং সিসি ক্যামেরা ছাড়াই পরিচালিত হিফজখানা ও আবাসিক মাদরাসাগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন, নিবন্ধন, মানসম্মত পাঠ্যক্রম, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, নিরাপদ অবকাঠামো এবং নিয়মিত প্রশাসনিক তদারকি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
শিশুদের মনস্তত্ত্ব ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ
শিক্ষকদের কেবল বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান থাকলেই চলবে না, বরং শিশুদের কোমল মনস্তত্ত্ব বুঝে বয়সোপযোগী ও মানবিক আচরণ করার সক্ষমতা থাকতে হবে বলে মত প্রকাশ করেন এই ইসলামি বক্তা। আবাসিক মাদরাসাগুলোর ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও মানসম্মত আবাসিক পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন, শিক্ষক নিবন্ধন, স্বচ্ছ অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং অপরাধী শিক্ষকদের ব্ল্যাকলিস্টিংয়ের মতো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর তিনি জোর দেন।
চাইল্ড সেফটি পলিসি ও শারীরিক শাস্তির অবসান
শিক্ষার নামে অতিরিক্ত শারীরিক শাস্তি, বেত্রাঘাত বা যেকোনো ধরনের মানসিক নির্যাতনের তীব্র সমালোচনা করে ড. আজহারী জানান, যে আচরণ একটি শিশুর মনে ভয় বা দীর্ঘমেয়াদী মানসিক ট্রমা সৃষ্টি করে, তা কখনোই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না। শাসন বা শৃঙ্খলা হতে হবে সম্পূর্ণ প্রজ্ঞা ও ভালোবাসার ভিত্তিতে। এ জন্য প্রতিটি মাদরাসায় কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বা ‘চাইল্ড সেফটি পলিসি’ প্রণয়ন এবং নিরাপদ উপায়ে অভিযোগ জানানোর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রাখার তাগিদ দেন তিনি।
পেশাগত সীমারেখা ও সমন্বিত সংস্কার
শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সম্পর্কের মাঝে একটি সুস্পষ্ট পেশাগত সীমারেখা থাকা উচিত বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, শাসনের নামে ভয় দেখানো কিংবা অনুপযুক্ত স্পর্শ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। যেকোনো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করে আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তবে সংস্কার মানে কোনো প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করা নয়, বরং তাদের সক্ষমতা বাড়িয়ে একটি নিরাপদ, আস্থাশীল ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা। দ্বীনি শিক্ষার পবিত্রতা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে আলেম-ওলামা, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সব মহলের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।