ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রধান রাজধানী বন্দরনগরী এডেনের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। এর আগে এডেনেই অবস্থিত প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে প্রাণঘাতী হামলার ঠিক পরের দিনই বিমানবন্দরের এই ওপর এই নতুন হামলার ঘটনা ঘটল।
ইয়েমেন সরকারের তথ্যমন্ত্রী মোয়াম্মার আল-এরিয়ানি জানান, গত শুক্রবার এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ের খুব কাছাকাছি পরপর দুটি ক্ষেপণাস্ত্র এসে আঘাত হানে। হামলার ঠিক সেই মুহূর্তে একটি যাত্রীবাহী বাণিজ্যিক বিমান উড্ডয়নের পূর্ণ প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সৌভাগ্যবশত, বিমানটি থেকে মাত্র ৫০০ মিটার (প্রায় ১,৬৪০ ফুট) দূরত্বের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রটি পতিত হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার)-এ দেওয়া এক বিবৃতির মাধ্যমে তথ্যমন্ত্রী নিশ্চিত করেন যে, বিমানটিতে থাকা সকল যাত্রী ও ক্রু সম্পূর্ণ নিরাপদ রয়েছেন। সম্ভাব্য একটি বড় ধরনের ‘ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়’ অলৌকিকভাবে এড়ানো সম্ভব হওয়ায় তিনি মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি, বেসামরিক বিমানবন্দরে এই ধরনের হামলাকে আন্তর্জাতিক আইন ও সুনির্দিষ্ট রীতিনীতির চরম লঙ্ঘন বলে কঠোর নিন্দা জানান তিনি।
এদিকে, ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হুথিদের একটি সামরিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে— শুক্রবার এডেন প্রদেশের বদর সামরিক শিবিরে অবস্থিত সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনীর কমান্ড সদর দপ্তর এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রাগার লক্ষ্য করেই মূলত তারা এই হামলা চালিয়েছিল।
অন্যদিকে, ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী ও ইরানপন্থী হুথি যোদ্ধাদের মধ্যকার চলমান সংঘাত সাম্প্রতিক সময়ে আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত শুক্রবার ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী দাবি করেছে যে, তারা রাজধানী সানার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মারিব প্রদেশের অভ্যন্তরে সফলভাবে সামনের দিকে এগিয়ে গেছে।
ইয়েমেনের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আল-নাজিলি জানান, যুদ্ধবিমানের জোরালো আকাশপথের সহায়তায় সরকারি বাহিনী মারিব প্রদেশের পূর্বাঞ্চলের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়েছে।
পাশাপাশি, গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে ৪৩০ জনেরও বেশি হুথি যোদ্ধা ‘নিষ্ক্রিয়’ (হতাহাত) হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে হুথিদের এক শতাধিক সামরিক যান ও বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র সম্পূর্ণ ধ্বংস কিংবা অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে।
দেশটির অন্যতম প্রধান রণক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত তাইজ প্রদেশেও হুথিদের বেশ কয়েকটি ‘বড় ধরনের’ আক্রমণ সফলভাবে প্রতিহত করার দাবি করেছে সরকারি বাহিনী। এই প্রতিরোধ লড়াইয়ে হুথি বিদ্রোহীদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে বলে জানানো হয়।
সম্প্রতি তাইজ শহরটিকে ঘিরে ফেলেছে হুথিরা, যা ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর। শহরটির সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রশাসনিক কেন্দ্র এডেনের যোগাযোগ রক্ষাকারী প্রধান সড়কটি ইতোমধ্যে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। চলমান এই তীব্র সংঘাতে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালানোর প্রবণতা বাড়ায় দেশটিতে গভীর মানবিক সংকট আরও বেশি ঘনীভূত হয়েছে।
উল্লেখ্য, বিমানবন্দরে এই হামলার ঠিক আগের দিন গত বৃহস্পতিবার এডেনে অবস্থিত দেশটির প্রেসিডেন্ট প্রাসাদেও আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় হুথিরা। সেই মর্মান্তিক হামলায় ৫ জন নিহত এবং আরও অন্তত ১৬ জন আহত হন। উল্লেখ্য, এই ঐতিহাসিক প্রাসাদ থেকেই মূলত সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের যাবতীয় রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে।