দৈনিক বাংলার আকাশ ডেস্ক:
কুষ্টিয়ায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) র্যাগিং ও জুনিয়রদের ওপর খবরদারিতে বাধা দেওয়ায় এক শিক্ষার্থীকে বয়কট, মারধর এবং ২৫ হাজার টাকা চাঁদা দাবির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী গত শনিবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর ও নিজ বিভাগের সভাপতির কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
ভুক্তভোগী তারিফ জামান রাজ লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি ওই ব্যাচের ক্লাস প্রতিনিধি (সিআর) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
অভিযোগে অভিযুক্ত হিসেবে তাঁর ব্যাচের আট সহপাঠীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন—আল-নাজিব মাহি, কাইয়ুম মোস্তফা, আব্দুল কাইয়ুম, মুজাহিদুল ইসলাম মিম, আবিদ বিন ইকরা, সায়েম হাফিজ সিয়াম, নবী হোসেন শুভ ও আব্দুল ফাত্তাহ আকিব। এছাড়া ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের জাহিদ মৃধা নামের এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীর ইন্ধন রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
যেভাবে বিরোধের সূত্রপাত:
ভুক্তভোগীর ভাষ্যমতে, চলতি বছরের জুলাই মাসে ক্লাস শুরুর পর ‘ম্যানার’ শেখানোর নামে জুনিয়রদের ওপর সিনিয়রদের অযাচিত হস্তক্ষেপে সিআর হিসেবে তিনি বাধা দেন। এর পর থেকেই একটি চক্র তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হয়। পরবর্তী সময়ে জাহিদ মৃধাসহ কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষার্থীর ইন্ধনে অভিযুক্তরা তাঁকে বিভাগ ও ব্যাচভিত্তিক বয়কট করে বিভিন্ন একাডেমিক গ্রুপ থেকে বের করে দেয়। পাশাপাশি কোনো ধরনের নির্বাচন ছাড়াই জোরপূর্বক আল-নাজিব মাহিকে নতুন সিআর মনোনীত করা হয়।
চাঁদা দাবি ও মারধরের ঘটনা:
গত ৯ সেপ্টেম্বর রাতে বয়কট তুলে নেওয়ার শর্তে অভিযুক্তরা তারিফ জামান রাজের কাছে ২৫ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে এবং নানা ভয়ভীতি দেখায়। নির্ধারিত সেই টাকা না দেওয়ায় গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে একটি নির্জন স্থানে তাঁকে আটকে মারধর করা হয়। এ সময় আল-নাজিব মাহি, আব্দুল কাইয়ুম ও কাইয়ুম মোস্তফা তাঁকে কিল-ঘুসি, লাথি ও চড়থাপ্পড় মারেন বলে অভিযোগে জানান তিনি।
অভিযুক্তদের বক্তব্য:
চাঁদার বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করেছেন অভিযুক্তরা। মারধরের বিষয়ে অভিযুক্ত আল-নাজিব মাহি দাবি করেন, ‘রাজ পরিবার ও মা-বাবা তুলে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করায় কথাকাটাকাটি ও হাতাহাতি হয়। রাজই প্রথমে গায়ে হাত তোলেন। এ ছাড়া ক্লাসের শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে ভোটের মাধ্যমে আমাকে সিআর নির্বাচিত করা হয়েছে।’
আরেক অভিযুক্ত আব্দুল কাইয়ুমের দাবি, রাজ তাঁকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করায় রাস্তা আটকে কারণ জানতে চাইলে রাজ তাঁকে ধাক্কা দেন। এর জবাবে কলার চাপাক্রান্ত করলে পরিস্থিতি জটিল হয়। তবে কাইয়ুম মোস্তফা মারধরের ঘটনা কিছুটা স্বীকার করে বলেন, পরিস্থিতির চাপে একপর্যায়ে রাজের গায়ে হাত তোলা হয়েছিল।
এদিকে জাহিদ মৃধা দাবি করেছেন, এই ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং এটি সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব ব্যাচের অভ্যন্তরীণ বিষয়।
অপরদিকে রাজের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো বানোয়াট। অতীতে ঘটে যাওয়া কিছু ছোটখাটো বিষয় শিক্ষকদের মধ্যস্থতায় আগেই সমাধান হয়েছিল। মূল বিষয় হলো—র্যাগিং ও ‘ম্যানার’ শেখানোর নামে চলা অনৈতিক কার্যক্রমে বাধা দেওয়াই তাঁর ওপর এই ক্ষোভের প্রধান কারণ।
প্রশাসনের পদক্ষেপ:
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে লোকপ্রশাসন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মুন্সি মুর্তজা আলী জানান, অভিযোগ পাওয়ার পরপরই জরুরি সভা ডেকে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সেলিমকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, ‘ভুক্তভোগী ও অভিযুক্তরা একই বিভাগের হওয়ায় বিষয়টি প্রথমে বিভাগীয় পর্যায়ে সমাধান হওয়াই শ্রেয়। সেখানে সুরাহা না হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’