দৈনিক বাংলার আকাশ ডেস্ক: কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে অনলাইন জুয়ার প্রবণতা। জীবিকার সুযোগহীনতা, তীব্র অর্থকষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদী অনিশ্চয়তার সুযোগ নিয়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন তরুণ রোহিঙ্গারা। এর ফলে ক্যাম্পগুলোতে শুধু ঋণগ্রস্ততাই বাড়ছে না, বরং অপহরণ, চাঁদাবাজি, পারিবারিক সহিংসতা এবং সশস্ত্র অপরাধের ঝুঁকিও বহুলাংশে বেড়ে গেছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)।
ক্যাম্পের বাসিন্দা জাহেদুল্লাহর অভিজ্ঞতা এই ভয়ংকর ফাঁদের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। ২০২২ সালে কাজ হারানোর পর এক বন্ধুর মাধ্যমে অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হন তিনি। শুরুতে কিছু টাকা লাভ হলেও মাত্র এক মাসের ব্যবধানে সব হারিয়ে ফেলেন। এরপর স্ত্রীর গয়না বিক্রি ও স্বজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে আরও সাড়ে সাত লাখ টাকা জুয়ায় ঢেলে সর্বস্বান্ত হন তিনি। পরবর্তীতে পরিবারের সহায়তায় দেনা শোধ করে জুয়া ছাড়তে সক্ষম হন তিনি।
ইউএনএইচসিআরের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আর্থিক সংকটের কারণে ক্যাম্পের তরুণরা জুয়ার দিকে ঝুঁকছেন। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে দ্বন্দ্ব, যা থেকে অনেক সময় শারীরিক সহিংসতার ঘটনাও ঘটছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, নির্যাতন ও সশস্ত্র গ্রুপে যুক্ত হওয়ার ৪৭০টি ঘটনায় ৫৯২ জন রোহিঙ্গা ভুক্তভোগী হয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা: ক্যাম্পে কর্মরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনলাইন জুয়াকে বিভিন্ন অপরাধের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছে। ১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক মোহাম্মদ সিরাজ আমীন জানান, জুয়ায় সর্বস্ব হারিয়ে অনেক সময় নিজেদের পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের জন্য রোহিঙ্গারা নিজেরাই অপহরণের নাটক সাজান।
তবে এই অপরাধ দমনে কিছু বাস্তবিক সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। জুয়াড়িরা ভিপিএন (VPN) ব্যবহার করায় তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া অনেক রোহিঙ্গা স্থানীয় নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে সিম ও মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট খুলে এ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। ভালো নেটওয়ার্ক রয়েছে—এমন নির্দিষ্ট কিছু স্থানে গিয়ে তরুণরা দলবদ্ধভাবে জুয়া খেলেন। এসব এলাকায় মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হলেও পুরোপুরি দমন করা সম্ভব হচ্ছে না।
উদ্বেগ ও ভবিষ্যৎ করণীয়: ইউএনএইচসিআর ও বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার ও ভাসানচর মিলিয়ে বর্তমানে ১২ লাখের বেশি নিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছে, যার অর্ধেকের বেশি শিশু ও কিশোর। কাজের সুযোগ ও বিনোদনের ঘাটতি থাকায় তরুণ সমাজকে অপরাধ থেকে দূরে রাখতে কিছু লার্নিং সেন্টারে লাইব্রেরি ও সহশিক্ষামূলক কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, তরুণদের এসব গঠনমূলক কাজে ব্যস্ত রাখতে পারলে অপরাধপ্রবণতা অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব।
শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, অতীতের সহিংসতা ও দীর্ঘ বঞ্চনার মানসিক প্রভাব রোহিঙ্গা সমাজে রয়েছে। তা সত্ত্বেও নানামুখী সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ক্যাম্পের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রশাসন।