দৈনিক বাংলার আকাশ ডেস্ক:
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কি মানুষের চাকরি কাড়বে, নাকি কর্মসংস্থানে নতুন দুয়ার খুলবে?—এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা চলছে। তবে উপযুক্ত কৌশল গ্রহণ করতে পারলে এআই বাংলাদেশের মতো শ্রমনির্ভর অর্থনীতির দেশের জন্য শ্রমিকের ‘বন্ধু’ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন কানাডীয় অর্থনীতিবিদ জ্যঁ-লুই আরকাঁ।
গতকাল সোমবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জ্যঁ-লুই আরকাঁ তাঁর সাম্প্রতিক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে মূলত উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় এআইয়ের প্রয়োগ এবং শ্রমবাজারে এর প্রভাব নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়।
‘ও-রিং’ মডেল ও এআই ব্যবহারের অগ্রাধিকার নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মাইকেল ক্রেমারের বিখ্যাত ‘ও-রিং’ মডেলের আলোকেই নিজের গবেষণাটি দাঁড় করিয়েছেন আরকাঁ। ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘চ্যালেঞ্জার’ মহাকাশযান দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল সামান্য একটি ‘ও-রিং’-এর ত্রুটির কারণে। ক্রেমারের এই মডেলের মূল কথা হলো—উৎপাদনপ্রক্রিয়ার অনেকগুলো জটিল ধাপের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে ভুল হলে পুরো প্রক্রিয়াই ব্যাহত হয়।
এই তত্ত্বের ভিত্তিতে আরকাঁ জানান, প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত উৎপাদনপ্রক্রিয়ার যে ধাপগুলোতে ভুল বা ব্যর্থতার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি এবং যেগুলো বড় বাধা তৈরি করে, সেগুলোতে আগে এআই ব্যবহার করবে। এটি কেবল উচ্চ দক্ষতার কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং কোডিং করা বা অনলাইন কাস্টমার সার্ভিসের মতো সেবা খাতের নানা ধাপেও ভুলের ঝুঁকি কমাতে ব্যবহৃত হতে পারে।
কর্মসংস্থান ও শ্রমবাজারে জোড়া প্রভাব জ্যঁ-লুই আরকাঁর মতে, কর্মসংস্থানে এআইয়ের প্রভাব দুইভাবে পড়তে পারে:
সহজ কথায়, এআই কোনো একটি একক কাজে মানুষের স্থলাভিষিক্ত হলেও সার্বিক উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে অন্য কাজের ক্ষেত্রে শ্রমিকের নতুন চাহিদা তৈরি করতে পারে।
মজুরির বৈষম্য দূর ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও-রিং মডেল অনুসারে, শ্রমিকদের দক্ষতার সামান্য পার্থক্যের কারণেই মজুরি ও উৎপাদনশীলতায় বড় ব্যবধান তৈরি হয়। তবে এআই দুর্বল ধাপগুলোকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে দক্ষতার এই ব্যবধান ও মজুরির বৈষম্য অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা একটি হিসাবে দেখা গেছে, এই প্রক্রিয়ার কারণে স্বল্পমেয়াদে দেশটির জিডিপি প্রায় ০.৫ শতাংশ বাড়তে পারে। অবশ্য এআই প্রযুক্তির বাস্তবায়ন খরচও অনেক বেশি হওয়ায় এটি খুব বড় অঙ্কের লাভ নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশের করণীয় ও সম্ভাবনা উচ্চ আয়ের দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশের মতো কম আয়ের ও শ্রমনির্ভর দেশগুলোতে এআইয়ের ইতিবাচক প্রভাব বেশি হতে পারে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। কারণ, এসব দেশে এখনও অনেক মানুষ কম উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত। তবে এই সুবিধা পেতে হলে বাংলাদেশকে পরিকল্পিত ও কৌশলী হতে হবে।
উৎপাদনব্যবস্থার মূল বাধাগুলো চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। আরকাঁ জানান, উন্নয়নশীল দেশে এআইয়ের সুনির্দিষ্ট প্রভাব বুঝতে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশে এআই ব্যবহারের বাস্তব চিত্র নিয়ে তথ্য সংগ্রহে তিনি আগ্রহ প্রকাশ করেন।
পরিশেষে তিনি জানান, শ্রমবাজারে এআইয়ের সঠিক প্রভাব এক কথায় বলা কঠিন প্রযুক্তির ধরন, ব্যবহারের ক্ষেত্র এবং এটি বাস্তবায়নের খরচের ওপরই শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে এআই শ্রমিকের বন্ধু হবে নাকি প্রতিপক্ষ।