দৈনিক বাংলার আকাশ ডেস্ক:
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীতে বাঁশের তৈরি বিশাল ফাঁদ স্থানীয়ভাবে ‘চাঁই’ নামে পরিচিত ব্যবহার করে পাঙাশ মাছের পোনা নির্বিচারে ধ্বংস করা হচ্ছে। এই অবৈধ চাঁইগুলো নদীর ৪০–৫০ ফুট গভীরে ফেলে রাখা হয়, যা শনাক্ত ও উদ্ধার করা প্রশাসনের জন্যও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে মেঘনা, তেঁতুলিয়া, সুগন্ধা, বিষখালী-বলেশ্বর-পায়রা মোহনাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অভয়াশ্রম ও প্রজননক্ষেত্রে পাঙাশের ভবিষ্যৎ মারাত্মক হুমকির মুখে।
কীভাবে কাজ করে এই চাঁই ফাঁদ :
চক্রটি সন্ধ্যার পর ইঞ্জিনচালিত নৌকায় নদীর গভীরে বিশাল বাঁশের চাঁই ফেলে দেয়। চাঁইয়ের ভেতরে শুঁটকি, খৈল, কুঁড়া, চিনি, চিড়া ও মাছের তেল মিশিয়ে তৈরি মণ্ড রাখা হয়, যা জোয়ারের স্রোতে ভেসে আসা পাঙাশের পোনাকে আকৃষ্ট করে। ছয় ঘণ্টা পর হোয়াটসঅ্যাপের ‘লাইভ লোকেশন’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট স্থানে ফিরে এসে চাঁই তোলা হয়। একেকটি চাঁই এত বড় যে তার ভেতরে দুই থেকে তিনজন অনায়াসে ঢুকতে পারেন এবং প্রতিটিতে আড়াই থেকে তিন মণ পর্যন্ত মাছ ধরা পড়ে।
বাজারে প্রতারণা: ‘নদীর ট্যাংরা’ নামে পাঙাশের পোনা বিক্রি
বাজারে পাঙাশের পোনাকে ‘পাঙাশ-ট্যাংরা’ বা ‘নদীর ট্যাংরা’ নামে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রকৃত ট্যাংরা একটি স্বতন্ত্র ক্যাটফিশ প্রজাতি, যার পিঠ কালচে, পেট রুপালি-সাদা এবং ফুলকা ধূসর-বাদামি। অন্যদিকে পাঙাশের পোনার পিঠ কালচে, ফুলকা গাঢ় বাদামি, মাথা ছোট এবং মুখ কিছুটা প্রশস্ত। বরিশাল নগরের চৌমাথা, বাংলাবাজার ও পোর্ট রোডের বাজারগুলোতে ৩ থেকে ৭ ইঞ্চি আকারের এই পোনা প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অনেক মাছ বিক্রেতাও জানেন না যে পাঙাশের পোনা ও ট্যাংরা আলাদা প্রজাতি।
গবেষণা ও পরিসংখ্যান: কতটা ক্ষতি হচ্ছে?
২০১৭ সালে ইকোফিশ বাংলাদেশ প্রকল্পের আওতায় শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে তেঁতুলিয়া নদীকেন্দ্রিক গবেষণায় পাঙাশের ১২টি গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন এলাকা শনাক্ত করা হয়। ২০১৯ সালে আরও কয়েকটি বিচরণক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র ২০ জন জেলে প্রতিদিন চাঁই ব্যবহার করে গড়ে ১২০ কেজি করে পাঙাশের পোনা ধরছেন। যেহেতু ৪০টি পোনা মিলিয়ে ১ কেজি হয়, সে হিসাবে ছয় মাসে অন্তত দুই কোটি পোনা নিধন হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ, কারণ আগের তুলনায় অনেক বেশি লোকজন এই অবৈধ পদ্ধতির সঙ্গে জড়িত।
প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ ও অভিযান :
মৎস্য বিভাগ ও কোস্টগার্ড নিয়মিত অভিযান চালালেও চাঁই জব্দ করা কঠিন। কারণ চাঁইগুলো এত গভীরে ফেলা হয় যে দুই-তিন ঘণ্টা অনুসন্ধান করেও অনেক সময় শনাক্ত করা যায় না। গত ২০ জুলাই বরগুনার পাথরঘাটার পদ্মা স্লুইসগেট-সংলগ্ন বলেশ্বর নদের তীর থেকে চারটি বিশাল চাঁই স্থানীয় লোকজন জব্দ করেন, যা পরে কোস্টগার্ড ও মৎস্য বিভাগ পুড়িয়ে ধ্বংস করে। গত ১ মে বরগুনার তালতলীর পায়রা-বিষখালী-বলেশ্বর মোহনা থেকে দুটি চাঁই উদ্ধার করে নৌ পুলিশ এবং বাউফলের দুই জেলেকে আটক করে মামলা করা হয়।
আইনি অবস্থা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত :
সরকারি আইন অনুযায়ী প্রতিবছর ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত ৩০ সেন্টিমিটারের নিচের পাঙাশ ধরা দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০১৪ সালের পর ইকোফিশ ও মৎস্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার ফলে ইলিশের পাশাপাশি নদীর পাঙাশের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছিল। তবে গবেষকরা সতর্ক করছেন, বর্তমান হারে পোনা নিধন চললে পাঙাশ প্রজাতিটি আবার হুমকির মুখে পড়তে পারে। বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক মো. আনিসুজ্জামান বলেছেন, এসব অবৈধ চাঁই মাছের বংশবিস্তারের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং জেলা-উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাদের বিশেষ নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সমাধানের দাবি :
গবেষক ও মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চক্র দ্রুত দমন করা না গেলে দেশের নদ-নদীতে পাঙাশের প্রজনন ও উৎপাদন আবার তলানিতে নেমে যেতে পারে। তাই অবৈধ চাঁই ও এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান, জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বাজারে প্রতারণা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।