দৈনিক বাংলার আকাশ ডেস্ক:
ভোরের আলো ফুটতেই রংপুর অঞ্চলের ওঁরাও গ্রামগুলোতে শুরু হয় বেঁচে থাকার ব্যস্ততা। কেউ ছুটছেন অন্যের ধানখেতে কৃষিশ্রমিকের কাজে, নারীরা ব্যস্ত গৃহস্থালি ও গবাদিপশু পালনে, আর শিশুরা প্রস্তুতি নিচ্ছে স্কুলের। দৃশ্যত স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মনে হলেও, দেশের উত্তরাঞ্চলের শত বছরের প্রাচীন ওঁরাও জনগোষ্ঠীর অন্তরালে চলছে ভূমি, নিজস্ব ভাষা ও ঐতিহ্য হারানোর এক কঠিন জীবনসংগ্রাম।
রংপুরের পীরগঞ্জের বড় পাহাড়পুর গ্রামের বুধু কুজুরের (৮২) মতে, ৫০ বছর আগেও এই গ্রামটি ছিল তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ৩০ বিঘা জমি হারিয়ে আজ তার সম্বল কেবল ৫ শতক বসতভিটা। একই দশা গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের। ৩৩টি পরিবারের মধ্যে এখন মাত্র তিনটির হাতে অল্প কিছু আবাদি জমি রয়েছে। অর্থাভাব, জমি সংক্রান্ত মামলার ব্যয় এবং স্থানীয় চাপে জমি বিক্রি করে অধিকাংশ ওঁরাও এখন ভূমিহীন কৃষিশ্রমিক। জীবিকার তাগিদে অনেকেই ইটভাটা, নির্মাণকাজ ও মৌসুমি শ্রমে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন।
জমি হারানোর পাশাপাশি তাদের কুরুখ (Kurukh) ভাষাও চরম বিলুপ্তির মুখে। দ্রাবিড় ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এই মাতৃভাষাটি এখন কেবল ৪০ উর্ধ্ব প্রবীণদের কথোপকথনেই সীমাবদ্ধ। প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যম বাংলা হওয়ায় নতুন প্রজন্ম কুরুখ ভাষায় কথা বলতে পারছে না, অনেকে তা বুঝতেও অক্ষম। কলেজের শিক্ষার্থী সুবর্ণা কুজুর জানান, তরুণরা ঐতিহ্য ধরে রাখলেও চর্চার অভাবে কুরুখ ভাষায় অভ্যস্ত হতে পারছে না। তবে আর্থিক সংকটের মধ্যেও তাদের সরহুল, কারাম ও সোহরাইয়ের মতো সনাতনী উৎসবগুলোতে মাদলের সুর ও লোকগীতি এখনো সংস্কৃতির জানান দেয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, দেশে প্রায় ৮৫ হাজার ৮৪৬ জন ওঁরাও জনগোষ্ঠীর বাস। উত্তরাঞ্চলে ব্রিটিশ আমলে তারা এসে স্থায়ী বসতি গড়লেও শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা এবং দারিদ্র্যের কারণে ওঁরাও শিশুরা মাঝপথে পড়াশোনা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।
নৃবিজ্ঞানী ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, ওঁরাওদের এই সংগ্রাম কেবল একটি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সংকট নয়; বরং এটি নিজস্ব সংস্কৃতি ও সত্তা রক্ষার লড়াই। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মাতৃভাষাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা, ভূমির অধিকার সুনিশ্চিতকরণ এবং তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি না করা গেলে শত বছরের এই ইতিহাস ও ঐতিহ্য চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।