ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকা ‘যন্তর মন্তর ২.০’ সমাবেশ ঘিরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে নজিরবিহীন ধরপাকড় চালিয়েছে পুলিশ। গত শনিবার (১০ অক্টোবর) দিনভর দিল্লির বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করে বিরোধী দলের শীর্ষ নেতা-কর্মী ও আন্দোলনকারীসহ সাত হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাত দিয়ে সংবাদভিত্তিক আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় গণমাধ্যম এই চাঞ্চল্যকর খবরটি নিশ্চিত করেছে।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আটককৃতদের তালিকায় রয়েছেন চার রাজ্যের সাবেক চার মুখ্যমন্ত্রী। তাঁরা হলেন—কেরালার জ্যেষ্ঠ সিপিএম নেতা পিনারাই বিজয়ন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ত্রিপুরার মানিক সরকার এবং দিল্লির অরবিন্দ কেজরিওয়াল। এর মধ্যে বিজয়ন ও কেজরিওয়াল যন্তর মন্তরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সময় আটক হন। অন্যদিকে, মানিক সরকারকে দিল্লি থেকে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর আবাসন প্রাঙ্গণ থেকে আটক করা হয়। এর আগে যন্তর মন্তরে যাওয়ার পথ অবরুদ্ধ দেখে মমতা সাউথ অ্যাভিনিউয়ে তাঁর ভাতিজা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারি বাসভবনের সামনের এক বাস ছাউনিতে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছিলেন। সেখান থেকে মমতার সঙ্গে তাঁর সঙ্গী সংসদ সদস্য দোলা সেন, প্রতিমা মণ্ডল, সামিরুল ইসলাম, সাকেত গোখলে ও ডেরেক ও’ব্রায়ানকেও পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়।
শনিবার সকালে বেঙ্গালুরু থেকে ফ্লাইটে দিল্লি পৌঁছানো মাত্রই বিমানের ভেতর থেকে সিজেপির তিন প্রভাবশালী নেতা অভিজিৎ দিপকে, আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে গ্রেপ্তার-আটক করা হয়। একই দিন সকালে গুরুগ্রামের নিজ বাসভবন থেকে আটক করা হয় জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে, যিনি ‘তেলাপোকাদের’ এই গণআন্দোলনে সংহতি জানাতে মাত্র তিন দিন আগে জার্মানি থেকে ভারতে এসেছিলেন। এছাড়া সিজেপির লিগ্যাল সেলের নেত্রী রত্না সিংকেও হেফাজতে নিয়েছে দিল্লি পুলিশ।
অভিযানের অংশ হিসেবে সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সভাপতি নেহা বোরাকেও আটক করে পুলিশ। যন্তর মন্তরে যাওয়ার পথ বন্ধ দেখে তিনি দক্ষিণ দিল্লির আইএনএ মার্কেটের কাছে জনপ্রিয় ‘দিল্লি হাট’-এর সামনে থেকে সমর্থকদের নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করলে সেখান থেকে তাঁকে আটক করা হয়। তবে পরবর্তীতে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সভাপতি নেহা বোরা শনিবার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় নিজ মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সিইসির পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত এই আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ ছিলেন তিনি।
একই মিছিল থেকে সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপংকর ভট্টাচার্য, প্রখ্যাত সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণসহ শতাধিক বিক্ষোভকারীকে আটক করে পুলিশ।
বিক্ষোভ চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি ও হামলার অভিযোগ উঠেছে। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে পৃথক এফআইআর (FIR) দায়ের করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে দিল্লি পুলিশ।
উল্লেখ্য, ভারতের ভোটার তালিকায় নানা অনিয়ম এবং বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে যন্তর মন্তরে বড় ধরনের সমাবেশের ডাক দিয়েছিল সিজেপি। তবে দিল্লি পুলিশ এই কর্মসূচির কোনো অনুমতি দেয়নি। সমাবেশস্থলে যাতে কেউ পৌঁছাতে না পারে, সে জন্য গোটা দিল্লিতে নিছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়। এতে বিভিন্ন মোড়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুরো নয়াদিল্লিকে বেশ কয়েকটি প্রশাসনিক জোনে ভাগ করা হয়। এছাড়া বিপুলসংখ্যক আটক ব্যক্তিদের সাময়িকভাবে রাখার জন্য দিল্লির তিনটি বড় স্টেডিয়ামকে অস্থায়ী আটককেন্দ্র বা জেল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
পুলিশি দমনপীড়ন সত্ত্বেও আন্দোলন থেকে সরছে না সিজেপি। সরকারের কড়া নিষেধাজ্ঞা ও বাধা উলেখে ঠেলে আজ রবিবার (১১ অক্টোবর) আবারও যন্তর মন্তর অভিমুখে নতুন করে যাত্রার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। অন্যদিকে, আগামীকাল সোমবার (১২ অক্টোবর) বিরোধী রাজনৈতিক জোট ‘ইন্ডিয়া’র পক্ষ থেকে বড় ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে আনুষ্ঠানিক স্মারকলিপি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
(তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, ডয়েচে ভেলে, দ্য টেলিগ্রাফ)