বিশ্বজুড়ে সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিপর্যায়ের ঋণ মারাত্মক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অর্থায়নবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স’ (আইআইএফ)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই বৈশ্বিক ঋণের পরিমাণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়ে ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। বৈশ্বিক এই ঋণের অঙ্ক পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের বিপরীতে গড়ে প্রায় ৪৪ হাজার ডলারের সমান। মূলত উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর আগ্রাসী ঋণ গ্রহণের প্রবণতা এই ঋণ বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে, উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোকে গত এক বছরে কেবল সরকারি বন্ডের সুদ পরিশোধেই ব্যয় করতে হয়েছে ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। বিশ্বব্যাপী সামরিক খাতের সম্মিলিত ব্যয় (৩.১ ট্রিলিয়ন ডলার), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বিনিয়োগ (২.৬ ট্রিলিয়ন ডলার) কিংবা পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে ব্যয় করা অর্থের (২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার) তুলনায়ও এই সুদ পরিশোধের অঙ্কটি অনেক বেশি।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘আল-জাজিরা’র একটি বিশেষ বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি, আবাসন সংকট এবং শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে এসেছেন। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালের বিভিন্ন বিক্ষোভ সহিংসতা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের রূপ নিলেও অনেক জায়গায় কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবেও পালিত হয়েছে। ক্রমবর্ধমান ঋণের সুদ পরিশোধের তীব্র চাপ এবং সরকারের নড়বড়ে আর্থিক সক্ষমতা এই সংকককে আরও ঘনীভূত করেছে।
ইউরোপের বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে ফ্রান্স
চলমান এই অসন্তোষ ও অর্থনৈতিক সংকটে সবচেয়ে বেশি আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ফ্রান্স। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, সাম্প্রতিক এক শনিবারে দেশজুড়ে ৫ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। শিক্ষা খাতের সংকট ও জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের প্রতিবাদে চলা ছাত্র আন্দোলনের মধ্যেই মূলত এই তীব্র গণবিক্ষোভ দানা বাঁধে।
জনঅসন্তোষের পাশাপাশি ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় আর্থিক অবস্থাও এখন সরকারের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটির ঋণ নেওয়ার ব্যয় ২০০২ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, নতুন ঋণ গ্রহণ কিংবা পুরোনো ঋণ পুনঃঅর্থায়ন করতে গিয়ে ফ্রান্সকে আগের তুলনায় অনেক বেশি চড়া সুদের খেসারত দিতে হচ্ছে। সরকারের আয়ের বড় একটি অংশ যদি কেবল ঋণের সুদ মেটাতেই ফুরিয়ে যায়, তবে স্কুল, হাসপাতাল, পেনশন এবং অন্যান্য জনসেবামূলক খাতে বাজেট বরাদ্দ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ে।
সরকার কীভাবে ঋণ নেয় এবং ঋণের খরচ বৃদ্ধির প্রভাব?
ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মতো সরকারও তার বিভিন্ন ব্যয় মেটানোর জন্য ঋণ নিয়ে থাকে। তবে ব্যাংক থেকে সরাসরি নেওয়ার পাশাপাশি সরকার সাধারণত বন্ড বিক্রির মাধ্যমে বিশাল অংকের তহবিল সংগ্রহ করে। বিনিয়োগকারীরা নির্দিষ্ট মেয়াদে বন্ড কিনে সরকারকে অর্থ দেন এবং সরকার বিনিময়ে তাদের নির্ধারিত হারে সুদ প্রদান করে ও মেয়াদ শেষে আসল টাকা ফেরত দেয়।
যেমন—১০ বছর মেয়াদি ১০০ ইউরোর একটি বন্ডে সুদের হার ২.৫ শতাংশ হলে বিনিয়োগকারী বছরে ২.৫০ ইউরো পান, আর সুদের হার ৫ শতাংশে দাঁড়ালে সুদ পরিশোধের সেই ব্যয়ও দ্বিগুণ হয়ে যায়। যখন সরকারি বন্ডের বাজারমূল্য কমে যায়, তখন এর ইল্ড (বিনিয়োগকারীর প্রত্যাশিত বার্ষিক মুনাফার হার) বৃদ্ধি পায়। ফলে সরকারকে নতুন ঋণ নিতে হয় অনেক চড়া সুদে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে জাতীয় বাজেটে; শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর মতো জনকল্যাণমূলক খাতগুলো তখন অবহেলার শিকার হয়।
আল-জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমান ইউরোপের প্রধান অর্থনীতিগুলোর ১০ বছর মেয়াদি সরকারি ঋণের সুদের হার ২০০০-এর দশকের শুরুর পর এতটা উঁচুতে আর দেখা যায়নি। বর্তমানে ফ্রান্সের এই সুদের হার প্রায় ৫ শতাংশ, যেখানে জার্মানির ক্ষেত্রে তা মাত্র ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। এমনকি ইউরোজোন ঋণসংকটে বিপর্যস্ত থাকা ইতালি ও গ্রিসের চেয়েও ফ্রান্সের বর্তমান ঋণের সুদের হার বেশি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে থাকা যুক্তরাজ্যের ঋণ গ্রহণের খরচ কেবল ফ্রান্সের চেয়ে কিছুটা বেশি রয়েছে।
বৈশ্বিক ঋণ চিত্র: শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র, জিডিপির অনুপাতে জাপান
মোট ঋণের পরিমাণের দিক থেকে বিশ্বে এককভাবে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১২৭ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীনের সরকারি ঋণ ২২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার (জিডিপির ১০৪ শতাংশ)।
জাপানের মোট সরকারি ঋণ ৮ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার হলেও, অর্থনীতির আকারের অনুপাতে ঋণের ভারে বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে দেশটি; জাপানের ঋণ তাদের জিডিপির প্রায় ১৯৯ শতাংশ। এছাড়া যুক্তরাজ্যের ঋণ ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার (জিডিপির ১০২ শতাংশ), ফ্রান্সের ঋণ ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার (জিডিপির ১১৮.৫ শতাংশ), ইতালির ঋণ ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার (জিডিপির ১৩৮ শতাংশ) এবং জার্মানির ঋণ ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার (জিডিপির ৬৫ শতাংশ)। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস বলছে, ২০৩০ সাল নাগাদ একাই ফ্রান্সের ঋণ জিডিপির ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে গিয়ে পৌঁছাতে পারে।
সাধারণ মানুষের ওপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব
রাষ্ট্রীয় ঋণের এই পাহাড়প্রমাণ বোঝা এবং চড়া সুদের ব্যয় কেবল সরকারি বাজেটেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। প্রথমত, সুদ পরিশোধের ঘাটতি মেটাতে সরকার কর বাড়াতে বাধ্য হয় অথবা জনসেবামূলক খাতের বরাদ্দ ছাঁটাই করে। দ্বিতীয়ত, সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়লে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বেসরকারি খাতের ঋণের সুদের হারও ঊর্ধ্বমুখী হয়, যার ফলে গৃহঋণ, গাড়ি কেনার ঋণ কিংবা ক্রেডিট কার্ডের কিস্তি পরিশোধের চাপ সাধারণ মানুষের ওপর বহুগুণ বেড়ে যায়।
পরিশেষে, ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক ঋণ এবং বছরে ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি কেবল সুদ পরিশোধের ব্যয় বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক গভীর অশনিসংকেত। অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণের খরচ দীর্ঘদিন ধরে এমন ঊর্ধ্বমুখী থাকলে সরকারের আর্থিক স্বাধীনতা যেমন সংকুচিত হবে, তেমনি জনকল্যাণমূলক বিনিয়োগ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান আরও বেশি সংকটের মুখে পড়বে।
(সূত্র: আল জাজিরা / বিডি প্রতিদিন)