প্রতিপক্ষের যেকোনো ধরনের সামরিক ভুল হিসাব বা আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে তাদের কল্পনারও বাইরে— ভারতকে উদ্দেশ্য করে এমন কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রসহ কৌশলগত সামরিক সক্ষমতার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও ‘জাতীয় কৌশলগত কমান্ড’-এর প্রধান জেনারেল আমের রাজা। ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সাম্প্রতিক এক হুমকিবাচক বক্তব্যের জবাবে আজ শনিবার (১৭ অক্টোবর ২০২৬) তিনি এই প্রতিক্রিয়া জানান। একই সঙ্গে ভারতকে গত বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার তাগিদ দিয়েছে ইসলামাবাদ।
পাকিস্তানের প্রথম সারির ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ডন’-এর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাকুলে অবস্থিত ‘পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি’র ১৫৪তম লং কোর্সের ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেনারেল আমের রাজা বলেন, সীমান্তের ওপারে যারা প্রতিনিয়ত শত্রুতার নীলনকশা আঁকছে, তাদের প্রতি পাকিস্তানের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার ও অনড়। পারমাণবিক অস্ত্রের উপস্থিতির এই যুগে কোনো যুদ্ধের সুযোগ নেই। এরপরও যদি কেউ ভুল হিসাব কষে হামলা চালাতে যায়, তবে তার এমন জবাব দেওয়া হবে যা আক্রমণকারীর কল্পনা কিংবা হিসাবের বহু বাইরে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, মাতৃভূমির প্রতিটি ইঞ্চি সীমান্ত ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী সব ধরনের আত্মত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত রয়েছে।
মূলত ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং গত বৃহস্পতিবার সীমান্তে নতুন করে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হলে গতবারের চেয়েও বড় পরিসরে সামরিক হামলা চালানো হবে বলে হুমকি দেন। তাঁর সেই বক্তব্যের জের ধরেই পাকিস্তানের পারমাণবিক ও কৌশলগত কমান্ডের প্রধানের পক্ষ থেকে এই পাল্টা জবাব এলো।
জেনারেল রাজা তাঁর বক্তব্যে বর্তমান সময়কে ‘সত্য-পরবর্তী যুগ’ (Post-truth era) হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, পরিকল্পিত অপতথ্য ও মিথ্যা প্রচারণার কৌশল ব্যবহার করে পাকিস্তানের জনগণ ও সামরিক বাহিনীর সুদৃঢ় ঐক্যে ফাটল ধরানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে প্রতিপক্ষ। (উল্লেখ্য, ‘সত্য-পরবর্তী যুগ’ বলতে মূলত এমন এক সময়কালকে বোঝানো হয় যখন বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-প্রমাণের চেয়ে আবেগ ও ব্যক্তিগত বিশ্বাস মানুষের জনমত গঠনে প্রধান ভূমিকা পালন করে)।
তিনি দাবি করেন, প্রতিপক্ষের পরিচালিত ‘অপারেশন সিন্দুর’ চরমভাবে ব্যর্থ হওয়ার পর তারা এখন ছায়া সন্ত্রাসবাদ এবং প্রথাগত যুদ্ধের বাইরের (Non-conventional) নানা চক্রান্ত ব্যবহার করে পাকিস্তানের সামাজিক সাম্য ও রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো দুর্বল করার পাঁয়তারা করছে। দেশের ভেতরের ছোটখাটো সামাজিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় ঐক্য বিনষ্টের চেষ্টা চলছে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
নবীন ক্যাডেটদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, এই চলমান সংঘাত সরাসরি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং পূর্বসূরিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার বিরুদ্ধে পরিচালিত হচ্ছে। তাই যেকোনো মূল্যে দেশের অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব ও সামাজিক ঐক্য রক্ষা করতে হবে।
আঞ্চলিক শান্তিতে পাকিস্তানের ভূমিকা ও ফিলিস্তিন প্রসঙ্গ
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বিস্তার ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে পরিবর্তনের এই সংকটময় সময়ে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে পাকিস্তানের কৌশলগত গুরুত্ব আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে উল্লেখ করেন জেনারেল রাজা। তিনি বলেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পাকিস্তানের জোরালো ভূমিকা এবং ঐতিহাসিক ‘ইসলামাবাদ চুক্তি’ শান্তি ও কূটনীতির প্রতি দেশটির গভীর অঙ্গীকারের বড় প্রমাণ। একই সঙ্গে ‘মক্কা চুক্তি’ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার সেই একই ভাবধারার অংশ।
ফিলিস্তিনিদের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করে তিনি বলেন, সেখানে নিরীহ নারী, পুরুষ ও শিশুরা প্রতিনিয়ত পরিকল্পিত নিপীড়ন ও চরম মানবিক দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। ফিলিস্তিনিদের প্রতি পাকিস্তানের কূটনৈতিক, নৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন সব সময় অবিচল থাকবে। বেসামরিক নাগরিকদের ওপর আক্রমণ ও লোকালয়ের অবকাঠামো ধ্বংস করা আন্তর্জাতিক আইনের মারাত্মক লঙ্ঘন।
এর আগে গতকাল শুক্রবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকেও ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের কড়া নিন্দা জানানো হয়। পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান বলেন, রাজনাথ সিংয়ের এমন বক্তব্য ভারতের স্পষ্ট আধিপত্যবাদী মানসিকতার পরিচয় বহন করে এবং তা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত বছরের মে মাসে ভারতের সামরিক আগ্রাসনের মুখে পাকিস্তান নিজদের কঠোর সামরিক সক্ষমতা ও অবস্থানপ্রমাণ করেছিল। পাকিস্তানের কূটনৈতিক সংযম কিংবা শান্তির নীতিকে কোনোভাবেই দুর্বলতা ভাবা উচিত নয়। যেকোনো নতুন আগ্রাসনের জবাব দেওয়া হবে অত্যন্ত কঠোরভাবে। তাই ভারতকে গত বছরের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য পরিহার করার আহ্বান জানায় পাকিস্তান।