দৈনিক বাংলার আকাশ ডেস্ক:
সন্তান জন্মের পর প্রতিটি মায়ের নতুন জীবনের যাত্রা সবসময় কেবল আনন্দের হয় না। প্রসবের পর শারীরিক নানা পরিবর্তন, হরমোনের দ্রুত ওঠানামা, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং নবজাতককে সামলানোর নতুন দায়িত্বের চাপে একজন মা মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই বিশেষ মানসিক অবস্থাকে বলা হয় পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বা প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন একটি অত্যন্ত গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যা সাধারণত সন্তান প্রসবের প্রথম কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসের মধ্যে দেখা দিতে পারে। তবে এটি কেবল প্রসবের পরপরই দেখা দেবে, এমন কোনো কথা নেই; পরবর্তীতেও এই সমস্যা প্রকট হতে পারে।
পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের পেছনে নির্দিষ্ট একটি কারণ থাকে না, বরং শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক—এই তিন ধরনের কারণ একসঙ্গে মিলে পরিস্থিতি জটিল করে তোলে। প্রসবের পরপরই মায়ের শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা হঠাৎ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। একই সঙ্গে মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটার বা রাসায়নিক উপাদানের পরিবর্তন মায়ের মেজাজ ও অনুভূতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এছাড়া নবজাতককে ঘন ঘন দুধ খাওয়ানো, কান্নাকাটি সামলানো এবং একটানা ঘুমের অভাব মা বৈশ্বিক শারীরিক ক্লান্তি ও মানসিক চাপে ভোগেন। এর ওপর যুক্ত হয় শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে ভয়, স্তন্যদানের সমস্যা এবং হঠাৎ পুরো জীবনধারা পরিবর্তন হয়ে যাওয়ার মানসিক চাপ।
পারিবারিক সমর্থনের অভাব এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে প্রসবের পর মায়ের শারীরিক বিশ্রাম ও পুষ্টিকর খাবারের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও ঘরের যাবতীয় কাজ ও শিশুর পুরো দায়িত্ব তার ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়। স্বামী বা পরিবারের অন্যদের সহানুভূতিশীল আচরণ না পাওয়া, একাকীত্ব এবং গর্ভাবস্থায় বা প্রসবের সময়ে জটিলতা ও মানসিক আঘাত এই ডিপ্রেশনের ঝুঁকি বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়।
অনেক ক্ষেত্রে সন্তান জন্মের প্রথম কয়েক দিন মায়ের মন খারাপ হওয়া, কান্না পাওয়া বা অস্থির লাগাকে ‘বেবি ব্লুজ’ বলা হয়, যা কয়েক দিনের মধ্যেই নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু মন খারাপ বা নিজেকে অপরাধী মনে করার অনুভূতি যদি দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলতে থাকে, জীবনের প্রতি তীব্র অনীহা তৈরি হয় কিংবা শিশুর প্রতি আবেগীয় টান কমে যায়, তবে বুঝতে হবে তা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের লক্ষণ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ অবস্থায় কোনোভাবেই মাকে দোষারোপ করা বা তাকে ‘খারাপ মা’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া যাবে না। উপযুক্ত চিকিৎসা ও সাইকোথেরাপির মাধ্যমে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসের মধ্যে মা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। তবে যদি মা নিজের বা শিশুর ক্ষতি করার কথা চিন্তা করেন কিংবা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, তবে দেরি না করে জরুরি ভিত্তিতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
সন্তান জন্মের পর শুধু নবজাতকের যত্ন নয়, মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি লক্ষ্য রাখা পরিবারের প্রধান দায়িত্ব। মায়ের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া, তাকে পর্যাপ্ত ঘুমানোর সুযোগ করে দেওয়া এবং ঘরের কাজ ও শিশুর দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়াই পারে একজন নতুন মাকে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে।