দৈনিক বাংলার আকাশ ডেস্ক:
অধিকৃত পশ্চিম তীরে জলপাই সংগ্রহের মৌসুম এলেই ফিলিস্তিনিদের জীবনে আনন্দ-উৎসবের বদলে নেমে আসে ভয় ও অনিশ্চয়তা। ফিলিস্তিনি কৃষকদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা জীবিকা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং জমির সঙ্গে তাদের নাড়ির টান আজ ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারী ও সেনাবাহিনীর যৌথ আগ্রাসনে চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, পশ্চিম তীরের উত্তরাঞ্চলের কুরইয়ুত গ্রামের ব্যক্তিমালিকানাধীন এক ফিলিস্তিনি জমিতে অবৈধভাবে ঢুকে পড়েছেন ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা। ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরের ওই বাগান থেকে তারা জোরপূর্বক জলপাই সংগ্রহ করছেন। ভিডিওতে আভিচাই সুইসা নামের এক বিতর্কিত বসতিস্থাপনকারীকে উল্লাস করতে দেখা যায়, যিনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর ফিলিস্তিনি কৃষকরা নিজেদের জমিতে যেতে না পারার সুযোগটিই নিচ্ছে এই চক্রটি।
অক্টোবরের এই জলপাই সংগ্রহ মৌসুমকে ফিলিস্তিনি কৃষকদের জন্য চলতি বছরটিকে সবচেয়ে খারাপ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। গত সপ্তাহে পশ্চিম তীরের রামিন ও বুরকা গ্রামের মধ্যবর্তী জমিতে জলপাই সংগ্রহ করতে যাওয়া ফিলিস্তিনি কৃষকদের লক্ষ্য করে গুলি চালায় সশস্ত্র বসতিস্থাপনকারীরা। এতে ৪৪ বছর বয়সী কৃষক আলী বাজ্জারি নিহত হন। এমনকি প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, ইসরায়েলি সেনাদের বাধায় আহতদের কাছে অ্যাম্বুলেন্স সময়মতো পৌঁছাতে পারেনি।
ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা ‘ইয়েশ দিন’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র ১০ দিনে জলপাই সংগ্রহকে কেন্দ্র করে ১০৯টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে, যা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১১টি।
ফিলিস্তিনিদের কাছে জলপাই সংগ্রহ কেবল কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়; এটি তাদের পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক হৃদ্যতা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি। পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী ও বন্ধুরা মিলে একসঙ্গে বাগানে গিয়ে ফল সংগ্রহ করেন। পারস্পরিক সহযোগিতার এই সুন্দর রীতির নাম ‘আউনেহ’।
বর্ষীয়ানরা তরুণ প্রজন্মকে গাছের পরিচর্যা ও আবহাওয়া বোঝার কৌশল শেখান, যা প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হয়। একটি বহুল প্রচলিত আরবি প্রবাদে এই দায়িত্ববোধ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে—‘তারা গাছ লাগিয়েছেন, যাতে আমরা খেতে পারি। আমরা গাছ লাগাই, যাতে তারা খেতে পারে।’
কিন্তু বর্তমানে ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, তাদের উচ্ছেদ করে ইসরায়েলিরা এই ঐতিহ্য নিজেদের বলে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও প্রচার করে অবৈধ খামার বা তেল তৈরির অভিজ্ঞতা অর্জনে অন্যদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।
শুধু বসতিস্থাপনকারীদের চুরি বা হামলা নয়, ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের মুখেও ধ্বংস হচ্ছে হাজার হাজার জলপাইগাছ। বেইত রিমা গ্রামের কৃষক হাজেম সানাফসহ বহু ফিলিস্তিনি চোখের সামনে বুলডোজার দিয়ে নিজেদের কয়েক দশক পুরোনো গাছগুলো গুঁড়িয়ে যেতে দেখেছেন।
ফিলিস্তিনের উপনিবেশায়ন ও দেয়াল প্রতিরোধ কমিশনের (সিআরআরসি) হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরেই ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারী ও সেনারা প্রায় ৫০ হাজার গাছ ধ্বংস করেছে। নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালালেও ফিলিস্তিনিদের মূল উদ্দেশ্য হলো তাদের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে ভিটেমাটিছাড়া করা।
আজ রামাল্লার আল-লুব্বান আশ-শারকিয়া গ্রামের ফুয়াদ দারাগমেহ বা অন্য কৃষকদের হাতে ভাঙা জলপাইগাছের কাণ্ড কেবল একটি গাছ হারানোর বেদনা নয়; এটি ফিলিস্তিনি অস্তিত্ব রক্ষার এক অসম লড়াইয়ের প্রতীক। অনেকে উপড়ে ফেলা গাছ বাঁচানোর চেষ্টা করলেও অনেকেই আশঙ্কা করছেন, হয়তো এই মৌসুমই তাদের জীবনের শেষ জলপাই সংগ্রহ।