দৈনিক বাংলার আকাশ ডেস্ক:
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের ১৬০টি দেশে সুনাম কুড়াচ্ছে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প। অভ্যন্তরীণ চাহিদার ৯৮ শতাংশ মিটিয়ে গত অর্থবছরে এই খাত থেকে রফতানি আয় এসেছে প্রায় ২৪ কোটি ডলার (প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা)। এশিয়া ছাড়িয়ে ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকার বাজারেও বাংলাদেশি ওষুধের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হয়েছে। তবে অপার সম্ভাবনাময় এই খাতটি সঠিক ও দূরদর্শী নীতি-কৌশল এবং নানা কাঠামোগত সংকটের কারণে কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোতে পারছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উৎপাদন ও রফতানিতে বড় বাধা নানা সংকট খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, তৈরি পোশাক খাতের বাইরে রফতানি আয়ে অন্যতম প্রধান ভরসা এই ওষুধ শিল্প। কিন্তু সরকারি প্রণোদনা বা অনুকূল নীতি-সহায়তার অভাবে গত ১৭ বছর ধরে এই খাতের প্রবৃদ্ধি আশানুরূপ নয়। এর ফলে গত ছয় বছর ধরে ফার্মাসিউটিক্যাল মার্কেটের আকার ৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যেই আটকে আছে। কাঁচামাল ও জ্বালানি সংকট, গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের কারণে উৎপাদন খরচ ক্রমেই বাড়ছে। এছাড়া বিগত ১০ বছর ধরে ওষুধের যৌক্তিক দাম সমন্বয় না করায় উদ্যোক্তারা বিপাকে পড়েছেন।
অন্যদিকে, এপিআই (API) শিল্প পার্কে প্লট বরাদ্দ পাওয়ার পরও গ্যাস সংযোগ ও সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (CETP) এর মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা না থাকায় উৎপাদন শুরু করা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো যেখানে ব্যবসা সহায়ক সর্বোচ্চ সুবিধা দিচ্ছে, সেখানে আমাদের বন্দর ব্যবস্থাপনা ও আমদানিসংক্রান্ত নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও ভ্যাকসিনে বড় বিপ্লব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও দেশের ওষুধ শিল্প এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে। একসময় ক্যান্সার, কিডনি, লিভার বা ফুসফুসের কার্যকর ওষুধের জন্য দেশের মানুষকে পুরোপুরি বিদেশমুখী থাকতে হতো। বর্তমানে দেশেই সাশ্রয়ী মূল্যে এসব জটিল রোগের ওষুধ ও লাইফ সেভিং ড্রাগ উৎপাদিত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ—ক্যান্সার সাপোর্টিভ কেয়ারের ‘পেগফিলগ্রাসটিম’ ইঞ্জেকশনের দাম একসময় ৪০ হাজার টাকার বেশি থাকলেও বর্তমানে তা মাত্র ৪ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
পাশাপাশি, র্যাবিস, হেপাটাইটিস বি, টাইফয়েড, টিটেনাস এবং এন্টিভেনামের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভ্যাকসিন এখন দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রশংসাধন্য এসব ভ্যাকসিন সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়ায় সাধারণ মানুষের বিদেশনির্ভরতা ও চিকিৎসা ব্যয় দুটোই অনেক কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শূন্যশুল্ক নীতি ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের ‘ট্রেড এক্সপ্যানশন অ্যাক্ট’-এর ২৩২ নম্বর ধারার আওতায় নির্দিষ্ট কিছু বিশেষায়িত ওষুধে (যেমন- অরফান ড্রাগ, জিন থেরাপি, সেল থেরাপি ও নির্দিষ্ট ভ্যাকসিন) শূন্যশুল্ক সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে। এই তালিকায় বাংলাদেশের নাম থাকলেও, স্থানীয় উৎপাদকদের এই মানের জটিল ওষুধ তৈরির সক্ষমতা সীমিত থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন শীর্ষ নির্বাহীরা।
বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের নির্বাহী পরিচালক শওকত হায়দার জানান, উন্নত প্রযুক্তির এসব ওষুধ উৎপাদনের জন্য প্রযুক্তি, গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর শর্ত মানতে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা এই মুহূর্তে আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া মার্কিন বাজারে ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো শক্তিশালী প্রতিযোগীদের মোকাবিলা করতে হবে।
ওয়ান ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান ও বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব ডা. মো. জাকির হোসেন মনে করেন, আমদানি কারক দেশের চাহিদা মেটানো এবং ওষুধ নিবন্ধনের জন্য দীর্ঘ সময় (১ থেকে ৩ বছর) অপেক্ষা করা রফতানির ক্ষেত্রে বড় দুই বাধা।
করণীয় উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এলডিসি উত্তরণের পর মেধাস্বত্ব ও পেটেন্ট জটিলতা মোকাবিলায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, এপিআই পার্কের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিশেষ নজর দেওয়া গেলে পোশাক খাতকে পেছনে ফেলে দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখতে পারে এই ওষুধ শিল্প।
আশা করি সংবাদটি আপনার চাহিদা অনুযায়ী সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। এ বিষয়ে আর কোনো সংশোধনের প্রয়োজন হলে জানাতে পারেন।