ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধ ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণে কোন অঞ্চলে এডিস মশার বংশবৃদ্ধি বেশি ঘটছে, তা সার্বক্ষণিক ও নিয়মিত জানা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সনাতন ও প্রচলিত পদ্ধতিতে ফাঁদে আটকে পড়া মশাগুলো সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে নিয়ে একটি একটি করে আলাদা পরীক্ষার মাধ্যমে এডিস মশা শনাক্ত করতে হয়, যা বেশ সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য বিষয়।
এই জটিল প্রক্রিয়াকে সহজ ও আধুনিক করতে শব্দের বিশেষ ব্যবহারের মাধ্যমে এডিস মশাকে ফাঁদে আকৃষ্ট করা, আটকে পড়া মশার ছবি তোলা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির সাহায্যে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত ও গণনার একটি যুগান্তকারী যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল। ‘মাস্ট-ক্লাউডনেট’ (MUST-CloudNet) নামের এই ডিভাইসটি ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংগৃহীত ছবি ও ডেটা সরাসরি দূরবর্তী সার্ভারে পাঠায়, যার ফলে অনলাইনের একটি ওয়েబ్ ড্যাশবোর্ডে মশার উপস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তিন দিনের প্রাথমিক মাঠপর্যায়ের গবেষণায় দেখা যায়, শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করা যন্ত্রটিতে মোট ৪৯টি এডিস এবং ১০টি অন্যান্য প্রজাতির মশা ধরা পড়ে। অর্থাৎ ফাঁদে আটকা পড়া মশার ৮৩.১ শতাংশই ছিল এডিস মশা। অন্যদিকে, কোনো শব্দতরঙ্গ ছাড়া থাকা সাধারণ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রে মাত্র একটি এডিস ও তিনটি অন্যান্য মশা আটকা পড়েছিল।
তবে মাঠপর্যায়ে প্রাথমিক পরীক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ৪৯টি এডিসের মধ্যে ৩৫টিকে শতভাগ সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পেরেছে। গবেষকরা মনে করছেন, মশা আকর্ষণ ও সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের ক্ষেত্রে এই ডিভাইসটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হলেও, বিশাল পরিসরে দীর্ঘমেয়াদী পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া এর চূড়ান্ত কার্যকারিতা সম্পর্কে এখনই শেষ সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
প্রযুক্তিভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘আইইইই ট্রানজ্যাকশনস অন ইনস্ট্রুমেন্টেশন অ্যান্ড মেজারমেন্ট’ (IEEE Transactions on Instrumentation and Measurement)-এ ২০২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই আধুনিক গবেষণাটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
যন্ত্রটি যেভাবে কাজ করে
স্ত্রী এডিস মশার ডানার নির্দিষ্ট কম্পন থেকে উৎপন্ন বিশেষ শব্দের প্রতি পুরুষ এডিস মশা আকর্ষিত হয়ে থাকে—বিজ্ঞানীদের এই ধারণাকে কাজে লাগিয়ে গবেষকরা ৩৫০ থেকে ৫০০ হার্টজের পরিবর্তনশীল শব্দতরঙ্গ সৃষ্টি করেছেন। যন্ত্রের ভেতরের শক্তিশালী ফ্যান বা পাখা মশাগুলোকে টেনে ভেতরে নিয়ে আসে। এরপর মশাগুলো একটি বিশেষ আঠাযুক্ত পৃষ্ঠে আটকে গেলে সাথে সাথে ইনবিল্ট ক্যামেরায় সেটির ছবি উঠে যায়। ছবিকে আরও পরিষ্কার ও স্পষ্ট করতে হলুদ ব্যাকগ্রাউন্ড এবং নির্দিষ্ট মাত্রার আলো ব্যবহার করা হয়েছে।
তোলা সেই ছবিগুলো ইন্টারনেটের সহায়তায় দূরবর্তী ক্লাউড সার্ভারে পাঠানো হয়। সেখানে যুক্ত থাকা ‘ইওলোভি১১’ (YOLOv11) নামের একটি উন্নত এআই মডেল মশার ধরণ বিশ্লেষণ করে এডিস ও অন্যান্য প্রজাতির মশা পৃথকভাবে গণনা করে। সবশেষে পুরো হিসাবটি একটি লাইভ ওয়েబ్ ড্যাশবোর্ডে ভেসে ওঠে।