যৌন নিপীড়ন ও নারী পাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত মার্কিন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরির মুখোমুখি বসে থাকা ছবি প্রকাশ্যে আসার পর দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র ঝড় উঠেছে। মার্কিন বিচার বিভাগের (ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস) প্রকাশিত নতুন নথির মাধ্যমে এই ছবিগুলো সামনে আসার পর থেকেই মন্ত্রীর তীব্র সমালোচনা এবং তাঁর পদত্যাগের দাবিতে জোরালোভাবে সরব হয়েছেন বিরোধী দলের নেতারা।
প্রকাশিত অন্তত দুটি ছবিতে দেখা যায়, স্যুট পরিহিত হরদীপ সিং পুরি এবং কালো সোয়েটার পরা জেফরি এপস্টিন একটি টেবিলে মুখোমুখি বসে আছেন। ছবিগুলোর টেবিলে কিছু কাগজপত্র ও অন্যান্য জিনিসপত্র ছড়ানো অবস্থায় রয়েছে এবং ওই ফ্রেমে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি নেই।
অথচ এর আগে মন্ত্রী পুরি দাবি করেছিলেন যে, আন্তর্জাতিক পিস ইনস্টিটিউটে (আইপিআই) তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নেতৃত্বে গঠিত একটি প্রতিনিধিদলের অংশ হিসেবেই কেবল তিনি এপস্টিনের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। কিন্তু নতুন প্রকাশিত এই ছবিগুলো তাঁর সেই আগের দাবিকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলো মার্কিন বিচার বিভাগের ‘এপস্টিন ফাইলসের’ অংশ, যা চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ‘ডেটাসেট ৯’-এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভারতীয় প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়্যার’ জানিয়েছে, ওই ডেটাসেটে বৈঠকটির অন্তত ১০টি ছবি রয়েছে, যেগুলোর ফ্রেম প্রায় অভিন্ন এবং কেবল কোণ বা অ্যাঙ্গেলে সামান্য পরিবর্তন রয়েছে।
‘দ্য ওয়্যারের’ পক্ষ থেকে করা প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রীর দপ্তর জানিয়েছে, ছবিটি ঠিক কোন বৈঠকের তা মন্ত্রীর নিজের মনে নেই। এমনকি ছবিটি তোলার আগে বা পরে অন্য কেউ উপস্থিত ছিলেন কি না, সে বিষয়েও তিনি কিছু স্মরণ করতে পারছেন না। তবে মন্ত্রীর দপ্তর দাবি করেছে যে, পুরি কখনো এমন কথা বলেননি যে তিনি এপস্টিনের সঙ্গে একান্তে দেখা করেননি।
বিরোধী দলগুলোর তীব্র আক্রমণ
নতুন এই ছবি প্রকাশ্যে আসার পর ভারতের বিরোধী দলগুলো একযোগে সরকারের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হয়েছে। ছবি প্রকাশের এই সময়টি কাকতালীয়ভাবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মুম্বাই সফরের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় তা নিয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী।
গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রাহুল গান্ধী লেখেন, “রুবিও মুম্বাইতে গেলেন। মার্কিন বিচার বিভাগ এপস্টিন ও পুরির ছবি প্রকাশ করল।” বিজেপি ও আরএসএসকে ইঙ্গিত করে তিনি আরও লেখেন, “প্রিয় বিজেপি এবং আরএসএস কর্মীরা, আপনাদের কি মনে হয় তারা কোনো দেশবিরোধী বিশ্বাসঘাতককে ব্ল্যাকমেল করছে?”
তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্রও অত্যন্ত কড়া ভাষায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে আক্রমণ করেছেন। পুরির পূর্বের ‘প্রতিনিধিদলের অংশ হিসেবে সাক্ষাতের’ দাবির প্রসঙ্গ টেনে তিনি এক্সে লিখেছেন, “তিনি (পুরি) আমাদের বলেছিলেন যে তিনি কেবল একটি প্রতিনিধিদলের অংশ হিসেবে তিন-চারবার এপস্টিনের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। অনুমান করছি এই দুই ছবিতে বাকি প্রতিনিধিরা টেবিলের নিচে লুকিয়ে ছিলেন।” অন্য একটি পোস্টে তিনি মন্ত্রীর উদ্দেশে লেখেন, “সামান্য লজ্জা রাখুন এবং অন্তত এখন থেকে মন্ত্রিসভার বৈঠকে অংশ নেওয়া বন্ধ করুন।”
এদিকে কংগ্রেস নেতা পবন খেরাও এই ইস্যুতে সরব হয়েছেন। মার্কিন বিচার বিভাগের ওয়েবসাইটের নথির বরাতে তিনি চাঞ্চল্যকর দাবি করে বলেন, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে এপস্টিন ও পুরির মধ্যে মোট ৬২টি ই-মেইল আদান-প্রদান হয়েছিল। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি লেখেন, “এ পর্যন্ত আমরা যা জানি তাতে ১৪টি বৈঠক এবং ব্যাপক যোগাযোগ হয়েছে, যার অনেকগুলোই ছিল মুখোমুখি বৈঠক। সাম্প্রতিক ছবিগুলো আমাদের দাবিকে আরও জোরালো করেছে, প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ছবি ফাঁসের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আগামী সপ্তাহে ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে আরও তীব্র উত্তেজনা ও রাজনৈতিক সংঘাত তৈরি হতে পারে।