ভিটামিন বি৩ শরীরের জন্য অত্যন্ত পরিচিত ও প্রয়োজনীয় একটি পুষ্টি উপাদান। তবে এবার এই সাধারণ ভিটামিনটিই চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন আশার সঞ্চার করেছে মস্তিষ্কের অন্যতম ভয়ংকর ক্যানসার ‘গ্লিওব্লাস্টোমা’র চিকিৎসায়। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির গবেষকদের প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচলিত চিকিৎসার পাশাপাশি উচ্চমাত্রার ভিটামিন বি৩ বা নিয়াসিন যুক্ত করলে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ক্যানসার কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। ছোট পরিসরের একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, এই থেরাপি নেওয়ার ছয় মাস পর প্রায় ৮২ শতাংশ রোগীর ক্যানসার নতুন করে বাড়েনি।
অবশ্য গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, ফলাফলটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক হলেও এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। চিকিৎসায় ব্যাপকভাবে ব্যবহারের আগে আরও বড় পরিসরে গবেষণা ও নিরাপত্তা যাচাই জরুরি।
যে ক্যানসারের চিকিৎসা অত্যন্ত কঠিন
গ্লিওব্লাস্টোমা প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অন্যতম আক্রমণাত্মক মস্তিষ্কের ক্যানসার। সাধারণত অস্ত্রোপচার, রেডিওথেরাপি এবং কেমোথেরাপির সমন্বয়ে এর চিকিৎসা করা হয়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার যতদূর সম্ভব অপসারণ করা হলেও এর সূক্ষ্ম কোষগুলো আশপাশের সুস্থ মস্তিষ্কের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা পুরোপুরি নির্মূল করা প্রায় অসম্ভব করে তোলে। ফলে চিকিৎসাসত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে ক্যানসার পুনরায় ফিরে আসে এবং রোগীদের বেঁচে থাকার হার দীর্ঘকাল ধরে প্রায় একই জায়গায় আটকে রয়েছে।
কেন ভিটামিন বি৩?
গবেষকদের মতে, গ্লিওব্লাস্টোমা কেবল মস্তিষ্কে টিউমারই তৈরি করে না, বরং শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকেও মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয়। ফলে ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো প্রতিরোধী কোষগুলোও অকার্যকর হয়ে পড়ে।
এই সমস্যার সমাধানে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির গবেষকেরা পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছেন, উচ্চমাত্রার নিয়াসিন ওই দুর্বল রোগপ্রতিরোধী কোষগুলোকে পুনরায় সক্রিয় করতে পারে কি না। এর আগে গবেষক উই ইয়ংয়ের নেতৃত্বে ইঁদুরের ওপর পরিচালিত পরীক্ষায় নিয়াসিন ব্যবহারের ফলে প্রাণীদের বেঁচে থাকার সময় বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেই সাফল্যের ভিত্তিতেই পরবর্তীতে মানুষের ওপর সম্মিলিত ফেজ-১ ও ফেজ-২ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হয়।
২৪ রোগীর ফলাফলে অভূতপূর্ব সাফল্য
বর্তমান গবেষণায় প্রচলিত কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির পাশাপাশি নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় নিয়াসিন প্রয়োগ করা হচ্ছে। গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো নিরাপদ মাত্রা নির্ধারণ এবং রোগের অগ্রগতি ঠেকানোর সময় (প্রগ্রেশন-ফ্রি সারভাইভাল) বৃদ্ধি করা।
বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন—পুরোনো গবেষণার তুলনায় ছয় মাসে ক্যানসারের অগ্রগতি ঠেকানোর হার অন্তত ২০ শতাংশ উন্নত না হলে ট্রায়াল বন্ধ করে দেওয়া হবে। তবে প্রথম ২৪ জন রোগীর ওপর চালানো ট্রায়ালে সেই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। ছয় মাস পর ৮২ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে ক্যানসারের কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি, যা আগের তুলনায় ২৮ শতাংশ বেশি।
রোগীদের জন্য নতুন সম্ভাবনা
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ক্যানসার বিশেষজ্ঞ গ্লোরিয়া রোলদান উর্গোইতি জানান, গ্লিওব্লাস্টোমার চিকিৎসায় দীর্ঘ সময় ধরে বড় কোনো অগ্রগতি আসেনি। তাই কঠোর প্রটোকল ও নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যেকোনো সম্ভাবনাময় পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চালানো অত্যন্ত জরুরি।
এই ট্রায়ালে অংশ নেওয়া ৫৫ বছর বয়সী এডওয়ার্ড ওয়াল্ডনারের জীবনেও এটি এনে দিয়েছে নতুন স্বস্তি। জটিল অস্ত্রোপচারের পর এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান তিনি। চিকিৎসকেরা যখন তার স্ক্যানের ফলকে ‘স্থিতিশীল’ বলে ঘোষণা করেন, তা তার জন্য স্বস্তির বড় খবর হয়ে আসে।
সতর্কতা: ভিটামিন বলেই নিজে থেকে সেবন নয়
গবেষকেরা অত্যন্ত জোরালোভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, ভিটামিন বি৩ সহজলভ্য হলেও সাধারণ মানুষ যেন নিজ উদ্যোগে উচ্চমাত্রায় এটি সেবন না করেন। অতিরিক্ত পরিমাণ নিয়াসিন শরীরে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে এবং বিষক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে এটি সম্পূর্ণ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে নির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় দেওয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য, এই গবেষণায় মোট ৪৮ জন রোগীকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৬ সালের শেষ দিক অথবা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে এই গবেষণার চূড়ান্ত ফল প্রকাশ বা বিশ্লেষণ করা হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
আপনার সংবাদ পোর্টালের ধরন অনুযায়ী শিরোনাম বা লিড অংশে সামান্য পরিবর্তন করে নিতে পারেন।