দৈনিক বাংলার আকাশ ডেস্ক:
জীবনে সব সময় একরকম পরিস্থিতি থাকে না। কখনো জীবনে নেমে আসে আনন্দের জোয়ার, আবার কখনো দুশ্চিন্তা, হতাশা কিংবা নানা অনিশ্চয়তা মানুষের মনে তীব্র চাপ তৈরি করে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক কিংবা সামাজিক নানা কারণে তৈরি হওয়া এই মানসিক অস্থিরতা একসময় দৈনন্দিন জীবনযাপনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ইসলাম ধর্মে কঠিন ও সংকটময় সময়ে আল্লাহর স্মরণ, তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা এবং একমাত্র তাঁর ওপর ভরসা করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এমন কিছু সুনির্দিষ্ট দোয়া ও আমলের কথা বলা হয়েছে, যা একজন মুমিনকে বিপদের মুহূর্তে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে এবং অন্তরে গভীর প্রশান্তি খুঁজে পেতে দারুণভাবে সহায়তা করে।
মানসিক অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তার সময়ে যে আমলগুলোর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে:
দুশ্চিন্তা ও বিপদের মুহূর্তে মুমিনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হলো দোয়া। আল্লাহর দরবারে নিজের কষ্ট, ভয় ও মনের আকুতির কথা তুলে ধরলে অন্তরে এক অদ্ভুত ভরসা তৈরি হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন—“যখন আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে, আমি তো (তাদের) কাছেই আছি। আহ্বানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে, আমি তার আহ্বানে সাড়া দিই।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৬)
দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ থেকে মুক্তির জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত একটি বিশেষ দোয়া পাঠ করতেন। দোয়াটি হলো:
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হুজনি, ওয়াল আজাজি ওয়াল কাসালি, ওয়াল বুখলি ওয়াল জুবনি, ওয়া দালায়িদ দাইনি ওয়া গালাবাতির রিজালি। অর্থ: “হে আল্লাহ, আমি আপনার আশ্রয় চাই দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে এবং ঋণের বোঝা ও মানুষের নিপীড়ন থেকে।” (বোখারি, হাদিস: ২৮২৯)
মানুষের জীবনে সংকট ঘনিয়ে এলে অনেক সময় প্রাপ্তির চেয়ে ‘না-পাওয়ার’ হিসাবগুলোই বেশি চোখে পড়ে, যা হতাণাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। অথচ আল্লাহর অশেষ নিয়ামতগুলো স্মরণ করলে জীবনের ইতিবাচক দিকগুলো উপলব্ধি করা সহজ হয় এবং অন্তরে কৃতজ্ঞতাবোধ জন্ম নেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—“তিনি তোমাদের সবকিছুই দিয়েছেন, যা তোমরা চেয়েছো। আর তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গুনে শেষ করতে পারবে না।” (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৩৪) তাই দুশ্চিন্তার সময়ে শুধু সমস্যার পাহাড়ের দিকে না তাকিয়ে আল্লাহপ্রদত্ত সুস্থতা, পরিবার, নিরাপত্তা ও রিজিকের মতো অমূল্য নিয়ামতগুলোর কথা স্মরণ করা উচিত।
বিপদের মুহূর্তে আল্লাহর ওপর গভীর আস্থা ও ভরসা রাখা মুমিনের মনে নতুন শক্তির জোগান দেয়। হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে যখন জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তখন তিনি সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা রেখেছিলেন।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে—“যাদের মানুষ বলেছিল যে নিশ্চয়ই লোকেরা তোমাদের বিরুদ্ধে সমবেত হয়েছে। সুতরাং তাদের ভয় করো। কিন্তু তা তাদের ঈমান বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং তারা বলেছিল, আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক!” (সুরা ইমরান, আয়াত: ১৭৩) পরের আয়াতেই আল্লাহ তাদের ওপর নিজের অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টির কথা ঘোষণা করেছেন। অর্থাৎ কঠিন সময়ে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা একজন মুমিনের জন্য অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
কঠিন পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে মানুষ মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারে বা অস্থির হয়ে উঠতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করা এবং নিয়মিত সালাত বা নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। পবিত্র কোরআনে এসেছে—“হে ঈমানদারগণ, ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৩)
জীবনের নানা প্রতিকূলতায় হতাশ না হয়ে অটল ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে, সময়মতো সালাত আদায় করতে হবে এবং আল্লাহর ওপর আস্থা বজায় রাখতে হবে। এই আমলগুলো কেবল দুশ্চিন্তাই দূর করে না, বরং আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ককে আরও গভীর ও সুদৃঢ় করে তোলে।